সিলেট অঞ্চলে বাড়ছে হত্যাকান্ড

প্রকাশিত: ৫:৫৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩১, ২০১৯

সিলেট অঞ্চলে বাড়ছে হত্যাকান্ড

অতিথি প্রতিবেদক :: সুষ্ঠু বিচার ও শাস্তি বিলম্বিত হওয়ায় সিলেটে খুনের ঘটনা বেড়েই চলছে। অতীতের অনেক হত্যাকান্ডের ঘটনা চাপা পড়ে যাওয়া ও বিচার সম্পন্ন হতে দেরি হওয়ায় খুনের এসব ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছেন অনেকে। নির্মম এসব ঘটনার মাঝে গোলাপগঞ্জে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে হত্যার ঘটনা সবাইকে হতবাক করেছে। গোলাপগঞ্জ উপজেলায় সন্তান চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ২৩ জুলাই গভীর রাতে ৬০ বছরের বৃদ্ধ সুন্দর খা তার ৫০ বছরের স্ত্রীকে শ্বাস্বরোধ করে হত্যা করেন। এ ঘটনায় তার পুত্র তারেক আহমদ বাদী হয়ে গোলাপগঞ্জ থানায় পিতা সুন্দর খাকে আসামী করে মামলা দায়ের করেন।

পুলিশ খবর পেয়ে নিহত মিনারা বেগমের লাশ উদ্ধার করে এবং সুন্দর খার কথা বার্তার সন্দেহ হলে তাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। পুলিশ গত ২৫ জুলাই বৃহস্পতিবার গোলাপগঞ্জ পৌরসভার রনকেলী নুরু পাড়া গ্রামের সুন্দর খাকে আদালতে হাজির করলে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তিনি খুনের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি প্রদান করেন। পরে আদালতের নির্দেশে পুলিশ তাকে কারাগারে নিয়ে যার।

এদিকে একই উপজেলার লক্ষনাবন্দ ইউনিয়নের ফুলসাইন্দ গ্রামের শাহীন মিয়ার স্ত্রী নাছিমা বেগম (২০) ২৩ জুলাই গলায় ফাঁস লাগিয়ে স্বামীর বাড়ীতে আত্মহত্যা করেন। মাত্র ৪ মাস আগে বিয়ে হওয়া নাসিমা বেগমের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

দক্ষিণ সুরমায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সহপাটির হামলায় গত ২৪ জুলাই বুধবার সিলেট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের শিক্ষার্থী তানভির হোসেন তুহিন (১৯) নামের এক যুবক খুন হয়। সে গোলাপগঞ্জের দক্ষিণ ভাগ পলিকাপন গ্রামের মানিক মিয়ার পুত্র। এ ঘটনায় কদমতলীর আব্দুল আলিমের পুত্র আবু কদরত তারেক (২০) কে আটক করে পুলিশ। জুতা হারানোকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকান্ড ঘটছে। নিহতের চাচা বাদী হয়ে ১০ জনের বিরুদ্ধ মামলা দায়ের করেন। এক আসামী আদালতে স্বীকারোক্তমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।

এদিকে, ছাতকের সিমেন্ট ফ্যাক্টরি এলাকায় গত ২৩ জুলাই মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ডেকে নিয়ে মেহেদী হাসান রাব্বীকে (২০) ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। রাব্বী ছাতক পৌর শহরের নোয়ারাই এলাকার প্রবাসী আলমগীর হোসেনের পুত্র।

সিলেটের গোয়াইনঘাটে গত ১৮ জুলাই প্রেমিকার পরকীয়ার বলি হন প্রেমিক নির্মল বিশ্বাস। ঘটনার পরদিন পুলিশ তথ্য উদঘাটনে নেমে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে ৫ জনকে গ্রেফতার করে। তাদের মধ্যে কনিকা বিশ্বাস খুনের সাথে জড়িত থাকার কথা ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকার করেন। পুলিশ নির্মল বিশ্বাসের ব্যবহৃত টিভিএস ব্রান্ডের মোটর সাইকেলটি গোলাপগঞ্জ থানা এলাকা থেকে উদ্ধার করে পুলিশ।

শহরতলীর কুমারগাওয়ে ৫ জুলাই বিকেল ৩টার দিকে এস.এম.পির জালালাবাদ থানার ফতেহপুর গ্রামের জিয়াউল হকের দ্বিতীয় স্ত্রী সালমা বেগম (২৮), তার সৎ মেয়ে মাহা (৫) কে সুরমা নদীর ব্রীজের উপর থেকে নদীতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। পরদিন ৬ জুলাই মাহার লাশ সুরমা নদীতে লামাকাজী এলাকায় ভেসে উঠলে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় জিয়াউল হক বাদী হয়ে স্ত্রী সালমাকে আসামী করে কন্যা হত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের কনের। ঘটনার সময় জনতা সালমা বেগমকে আট করে পুলিশ দেয়। সালমা ও সন্তানের জননী। পরে স্বামীর দায়ের করা মামলার ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়ে সালমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে হাজির করে পুলিশ। পরে আদালতের নির্দেশে পুলিশ তাকে কারাগারে নিয়ে যায়।

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার দিন মঞ্জুর জুনাব উদ্দিনকে (জুনাইদ) প্রতিপক্ষ ৫ জুলাই পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র হত্যা করে। নিহত দিনমজুর মনসুর নগর ইউনিয়নের মালিকোনা গ্রামের বাসিন্দা।

হবিগঞ্জে জমি সংক্রান্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১৭ জুন ভাতিজা দুলাল মিয়াকে খুন করেন বিজিবির সদস্য চাচা সাদেক মিয়া। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে বেওয়ারিশ হিসেবে জুবাইন কবরস্থানে দাফন করেন। এ ঘটনায আদালতে দুজন আসামী স্বকারোক্তি মুল জবানবন্দি ও দিয়েছেন। সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলা নিজ বসতঘর থেকে ৪ জুলাই দিবাগত রাতে সদর ইউনিয়নের মাইঝখলা গ্রামের মকদ্দুছ আলীর পুত্র আবিজ আদলী (৪৫) কে রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা গলা কেে হত্যা করে। পরে ময়না তদন্ত শেষে লাশ দাফন করা হয়। এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়।

সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার সদর এলাকার জানাইয়া গ্রামে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। গত ৬ জুলাই বিকেলে পুলিশ জানাইয়া ফুটবল খেলার মাঠ সংলগ্ন আকবর আলীর কলোনী থেকে একটি শিশুর লাশ উদ্ধার করে। নিহত শিশু নাম ইয়াছমিন বেগম (১০)। সে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার সেলবরস চৌধুরী বাড়ীর মৃত খায়রুল ইসলামের মেয়ে।

দক্ষিণ সুরমার সিলামে ১২ জুলাই পুকুর থেকে গোয়াল গ্রামের মৃত আব্দুল নুর মাস্টার পুত্র মো: কামরান আহমদ (২৬) তার লাশ উদ্ধার করেন। সে একজন রং মিস্ত্রী।

এ ঘটনার একদিন আগে খালেদ নামের এক যুবক অপহৃত হয়। সুরমা মার্কেটের ১নং গেইটের দুই তলা থেকে গত ১৯ জুলাই অজ্ঞাত ৫০ বছরের এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

মৌলভীবাজার জেলার জুড়ীতে নিখোঁজের তিন দিন পর ১৪ জুলাই শিবুল মিয়া (২৫) নামের এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। সে জাফর নগর ইউনিয়নের শাহাপুর গ্রামের মৃত আহমদ আলীর পুত্র। হবিগঞ্জের মাধবপু বাস স্ট্যান্ড এর টিকেট কাউন্টার থেকে শাহ আলম (৩০) নামের এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০ জুলাই সকালে ঢাকা গামী একটি বাসের কাউন্টার থেকে এ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত শাহ আলম বিবাড়ীয়ার বিজয় নগর উপজেলার সাতগাও গ্রামের বাসিন্দা।

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার টিকাবহর গ্রামের পুনয় দে (৪০) এর লাশ গত ২৬ জুলাই দুপুরে উদ্ধার করে পুলিশ। সে সুনামগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ইনামপুর গ্রামের বাসিন্দা পরেশ দের পুত্র।

হবিগঞ্জের মাধবপুরে সিগারেট কিনতে গিয়ে এক টাকা পাওনাকে কেন্দ্র করে গত ১১ জুলাই আব্দুল জব্বার (৩০) নামের এক গার্মেন্টস কর্মী নিহত হন। আব্দুল জব্বার মাধবপুর উপজেলার নোয়া পাড়া ইউনিয়নের মৃত সিরাজ মিয়ার পুত্র। সিলেটে অনেক খুনের ঘটনায় আসামীরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।

সিলেট মেট্টোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) জেদান আল মুসা সিলেটে হত্যাকান্ড বৃদ্ধির ব্যাপারে বলেন, সমাজে খুনের মতো ঘটনা থেকে রেহাই পেতে সামাজিক সচেতনতা বেশী প্রয়োজন। পুলিশ খুনের সাথে জড়িতদের গ্রেফতার করে আদালতে বিচারের জন্য পাঠায়। তবে অপরাধ কমাতে পুলিশের পাশাপাশি জনগনকে আরো সজাগ থাকতে হবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  

Send this to a friend