সিলেটে নেই বৃদ্ধাশ্রম : বয়স্কদের জীবন কাটছে রাস্তায়

প্রকাশিত: ১২:৪৮ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১, ২০১৯

সিলেটে নেই বৃদ্ধাশ্রম : বয়স্কদের জীবন কাটছে রাস্তায়

রেজওয়ান আহমদ :: ‘ছেলে আমার মস্ত মানুষ, মস্ত অফিসার, মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার ওপার। নানান রকম জিনিস আর আসবাব দামী দামী সবচেয়ে কম দামী ছিলাম একমাত্র আমি। ছেলের আমার আমার প্রতি অগাধ সভ্রম আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম!’ বাস্তবমূখি লেখক ও শিল্পী নচিকেতার গানের প্রতিটি শব্দ যেন মানুষের জীবনে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
সিলেটে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অসহায় বয়স্ক বৃদ্ধাদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এক সময় যাদের বাড়ি-ঘর পরিবার ছিল আজ তারা সবকিছু হারিয়ে পথে পথে ঘুরছেন। আর যাদের আছে তারাও পরিবারের অবহেলায় রাস্তার বাসিন্দা হয়ে পড়েছেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে পরিবারের কাছে তারা মূল্যেহীন হয়ে পড়ছেন। একদিন যার উপার্জনে পরিবার চলত আজ থাকে রাস্তার ফুটপাতে ঘুমাতে হয়। সারাদিন ভিক্ষা করে যে টাকা আয় করছেন তা দিয়ে পেট ভরে ভাত খাওয়া দায় হয়ে দাড়িয়েছে। যার কারণে ভাষা ভাড়া দিয়ে থাকার মত সামর্থ নেই তাদের। ফলে ২৪ ঘন্টাই ফুটপাতে থাকতে হয়। দিনের বেলায় ভিক্ষা করে রাতে ফুটপাতে কেউ রাস্তার পাশে, আবার কেউ দোকানের বারান্দায় ঘুমিয়ে পরছেন। না আছে তাদের খাতা-বালিস। এই সব বয়স্ক মানুষদের কষ্টের যেন সিমা নেই। যে বয়সে পরিবার পরিজনদের সাথে থাকার কথা আজ তারা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হচ্ছে আপনজনদের অবহেলার কারণে। সেই বয়সে দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিয়ে চলছে তাদের জীবন।
জীবনের বেশির ভাগ সময় পরিবারের জন্য কষ্ট করে টাকা উপার্জন করে খাদ্য যোগান দিয়েছেন। ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে নিজের জন্য কিছু করেন নি। তার প্রতিদান পাচ্ছেন যে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। পরিবার আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সুখ-শান্তিতে থাকার বদলে পথে-পথে ঘুরে জীবন চলছে তাদের। সে বয়সে একাকিত্ত জীবনের কষ্টের শেষ নেই। খেয়ে না খেয়ে পার হচ্ছে তাদের জীবন। বয়সের ভারে কেউ কেউ নুয়ে পড়েছে। অনেকেই হাটা চলা করতে পারছেন না। এক জায়গায় বসে থেকেই জীবন সংগ্রাম করে যাচ্ছেন তারা। হাটা চলা করতে হলে লাটির মধ্যে ভর দিয়ে চলতে হয় তাদের। পথচারীদের কাছে অসহায়ের মত হাত পেতে ভিক্ষা চাচ্ছেন তারা। কেউ টাকা দিচ্ছে আবার কেউ গাল-মন্দ করছে। প্রতিদিনি ভিক্ষা করে যে টাকা পাচ্ছেন তা দিয়ে কোনো মতে জীবনটাকে চালিয়ে নিচ্ছেন তারা। বয়সের কারণে অনেকেই মৃত্যুবরণ করছেন ফুটপাতে। ফুটপাতে মৃত্যুবরণের ফলে এই সব ব্যক্তিদের পরিচয় না জানা থাকায় বেওয়ারিশ হিসেবে তাদের লাশ দাফন করা হচ্ছে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বয়স্ক পুরুষ-মহিলারা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভিক্ষা করে যাচ্ছেন। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এক সময় পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে শান্তিতে ছিলেন তারা। নিজে পরিশ্রম করে টাকা উপার্জন করে পরিবারের চাহিদা মেটাতেন তারা। প্রতিদিন যা আয় করতেন তা দিয়ে কোনো রকম চলত তাদের জীবন। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে শুরু হতে থাকে কষ্টের জীবন। বয়সের কারণে নিজে আর কাজ কর্ম না করতে পারায় ধিরে ধিরে টাকা উপার্জন করা বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের চাহিদা আর সাধ্য মত মেটাতে পারেন না। বয়সের কাছে হার মানতে হয় তাদের। পরিবারও ভরসা করতে পারেন না বয়স্ক মানুষটির কাছ। এক সময় নিজেরাই টাকা উপার্জন করতে থাকেন। যার ফলে বয়স্ক মানুষটি তার কাছে বোঝা হয়ে পরে। নিজে টাকা উপার্জন করতে না পারায় অসহায়ের মত চলতে হয় তাকে। পরিবারও একসময় যে মানুষটির অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে চলত তারাও বয়সের কারণে অবহেলা করতে থাকেন এই মানুষটিকে। একসময় পরিবারের লোকজন তাদের ঘর থেকে বের করে দেন। পরিবার পরিজন হারিয়ে এই বয়স্ক মানুষদের ঠিকানা হয় ফুটপাত।
নগরীর চৌহাট্রা এলাকায় রাতে কথা হয় আনসার আলী (৭৫), গফুর মিয়া (৭০)’র সাথে তারা জানান ২জনের বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ এলাকায়। পরিবারের সাথে সুখে-শান্তিতে ছিলেন তারা। নিজেরা কাজ কর্ম করে টাকা উপার্জন করে পরিবার চালাতেন। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে কাজ কর্ম করতে পারতে না তারা। পরিবারের লোকজন অবেহেলা করতে থাকে তাদের। এক সময় পরিবার ছেড়ে সিলেট নগরীতে এসে ভিক্ষা করে চালিয়ে যাচ্ছে জীবন। যে খানে রাত হয় সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েন তারা। সিলেট বিভাগে পরিবার বিচ্ছিন্ন বয়স্ক মানুষের জন্য সরকারী ও বেসরকারী ভাবে নেই কোন বৃদ্ধাশ্রম।
এ ব্যাপারে সিলেটের প্রবীণ ফটো সাংবাদিক আতাউর রহমান আতা বলেন, সিলেটে অসহায় বৃদ্ধাদের জন্য কোন বৃদ্ধাশ্রম নেই। যারা পরিবারের অবহেলায় শেষ বয়সে মানবেতর জীবন যাপন করছেন ফুটপাতে। এমনও বয়স্ক মানুষ আছে যারা হাটা চলাও করতে পারে না। এক জায়গায় পরে থাকেন। সরকারী-বেসরকারী ভাবে যদি বৃদ্ধাশ্রম থাকত তা হলে এই সব বয়স্ক মানুষরা কিছুটা হলেও সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারত।

 

সিলেটপ্রেসডটকম /০১ ডিসেম্বর ২০১৯/ রাকিব হাসান

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ