সিলেটসহ সারাদেশে আরও এক শ’ অর্থনৈতিক অঞ্চল হবে

প্রকাশিত: ১২:৪০ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৭, ২০২০

সিলেটসহ সারাদেশে আরও এক শ’ অর্থনৈতিক অঞ্চল হবে

উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্ন পূরণের রূপকল্প ★ দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ★ দ্রুত বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ ★ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বৃদ্ধি

সিলেটপ্রেস ডেস্ক :: উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্ন পূরণে দ্বিতীয় ধাপে আরও এক শ’ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ, এসব বিনিয়োগের ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বৃদ্ধি এবং দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় সরকার দ্বিতীয় দফায় এই একশ’ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় জমি খোঁজা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) তথ্যানুযায়ী, প্রথম ধাপের একশ’র মধ্যে ৯০ অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্থান ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সারাদেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কার্যক্রম চলছে। এসব অঞ্চলে প্রায় এক কোটি লোকের কর্মসংস্থান হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। মীরসরাই, সোনাগাজী ও সীতাক- উপজেলার ৩০ হাজার একর জমিতে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর’কে দেশের সর্ববৃহৎ পরিকল্পিত ও আধুনিক শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে এ পর্যন্ত ১৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ প্রথম ধাপের ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কাজ শেষ হবে।

সরকারী-বেসরকারী খাতের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। সব ধরনের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত এসব অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ খুব বেশি। বিশেষ করে চীন, জাপান, ভারত, কোরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রয়েছে এমন সব দেশের উদ্যোক্তাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু এখন বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগে সরকার অনেক সুবিধা নিশ্চিত করেছে। অনেকটা ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মতোই সব কিছুর অনুমোদন সহজ। অনুমোদন ছাড়াও দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সহজে বিদ্যুত সংযোগ, নিরাপত্তা, কাজের পরিবেশ ইত্যাদি কারণে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে। বিশেষ করে শ্রমিক মজুরি অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম হওয়ার কারণে বিদেশী বিনিয়োগ আসছে বেশি।

দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখে সরকার দ্বিতীয় ধাপে আরও ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে দেশে ব্যাপক শিল্পায়ন ও উৎপাদন সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে করণীয় ও কৌশল নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারী শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান জানিয়েছেন, অনেক দেশ বাংলাদেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ব্যাপক শিল্পায়ন ও উৎপাদন বাড়াতে দ্বিতীয় ধাপে আরও ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছে সরকার। তিনি বলেন, প্রথম পর্বের কাজ শেষ হলে দ্বিতীয় ধাপে নতুন করে আরও ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল করার উদ্যোগ নেয়া হবে। তিনি বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্নপূরণে দেশে ব্যাপক ভিত্তিতে শিল্পায়ন হওয়া প্রয়োজন। আর এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনায় দেশে দ্রুত অর্থনৈতিক অঞ্চল করে দেয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার পর গত ১২ বছরে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে শামিল হতে ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে বাংলাদেশের। এ লক্ষ্যে রূপকল্প-২১ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে। মধ্যম আয় থেকে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছাতে রূপকল্প-২১ ঘোষণা করেছে শেখ হাসিনার সরকার। এই লক্ষ্য অর্জনে ব্যাপক শিল্পায়নের পাশাপাশি কৃষিতে উৎপাদন বাড়াতে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করা হচ্ছে। কিন্তু শিল্পায়ন ও বিনিয়োগে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে জমি সঙ্কট। কারখানা স্থাপনে পর্যাপ্ত ও ভেজালমুক্ত জমি পাওয়া যায় না। ইতিপূর্বে বহু বিদেশী বিনিয়োগকারী জমি না পেয়ে বাংলাদেশ থেকে অন্য দেশে চলে গেছেন। এই সঙ্কট উত্তরণে বর্তমান সরকার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এখন সেই পরিকল্পনার আওতায় দেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে। প্রথম ধাপের ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য পর্যাপ্ত জমি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ভূমি সচিব মোঃ মাকসুদুর রহমান পাটওয়ারী। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, সরকারী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য প্রয়োজনীয় জমি খুঁজে বের করার বিষয়টি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেই কাজটি করা হচ্ছে। প্রথম ধাপের ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্যই জমি পাওয়া গেছে। ভূমি সচিব বলেন, ব্যাপক শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের জন্য আরও জমির খোঁজ করা হচ্ছে। দেশে পর্যাপ্ত অব্যবহৃত জমি রয়েছে। এসব জমি অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ দেবে সরকার।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে বিনিয়োগ। গত ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ২৬ শতাংশ। গত অর্থবছরে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশে। বেসরকারী খাতে বিনিয়োগ ১৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ৭০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই সময় জিডিপির আকার ছিল ৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, এখন সেটা ৪ গুণ বেড়ে ৩০২ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। শুধু তাই নয়, জিডিপি র‌্যাংকিং অনুযায়ী বাংলাদেশ পিপিপি ভিত্তিতে এখন পৃথিবীতে ৩০তম অর্থনীতির দেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরই দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি বাংলাদেশের।

এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। ইতোমধ্যে এসব অঞ্চলে প্রায় সোয়া ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। তিনি বলেন, রূপকল্প-৪১ বাস্তবায়নে দেশে ব্যাপক ভিত্তিতে শিল্পায়ন করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। এদিকে, বেজার পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, একশ’টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের পর শুধু এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানই সৃষ্টি হবে না, বছরে অতিরিক্ত ৪০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যও রফতানি হবে।

সংস্থাটির নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী সম্প্রতি এ সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে বলেন, ২০১৫ সালে জোরেশোরে যাত্রা শুরুর পর পদে পদে তাদের বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। শুরুতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব অনেকে বুঝে উঠতে পারেননি। এখন সারাদেশে অন্তত ২৮টি অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ চলমান আছে। মংলা ও সিলেটের শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, মংলার জন্য দুইবার দরপত্র আহ্বান করেও বেজা ব্যর্থ হয়েছিল। শ্রীহট্টতেও খুব সামান্য টাকার বিনিময়ে জমি চাওয়া হয়েছিল শুরুতে। এখন সেই পরিস্থিতি একেবারে কেটে গেছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো গড়ে তোলার জন্য জমি পাওয়া যাচ্ছে। মিরসরাই, সিলেট, মুন্সীগঞ্জ ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও অনেক অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে।

জানা গেছে. চট্টগ্রামের মিরসরাই, সীতাকু- ও ফেনী ঘিরে ৩০ হাজার একর জমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর। সেখানেই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে। বেজার হিসেবে, বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ প্রস্তাব ১ হাজার ২৩৯ কোটি ডলারের। এতে জমি নিয়েছে ৬৯টি প্রতিষ্ঠান। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগের জন্য জমি নিয়েছে বিদেশী বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে জাপানের হোন্ডা মোটর কর্পোরেশন, দক্ষিণ কোরিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম কোম্পানি এস কে গ্যাস, বিশ্বের তৃতীয় বড় ইস্পাত উৎপাদক প্রতিষ্ঠান জাপানের নিপ্পন স্টিল। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে খেলনা রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। সূত্র-দৈনিক জনকণ্ঠ

সিলেটপ্রেসডটকম/১৭ জানুয়ারি ২০২০/এফ কে

Send this to a friend