মৌলভীবাজারের জোড়া খুন : ২ বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত

প্রকাশিত: ৫:৫৫ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ৮, ২০১৯

মৌলভীবাজারের জোড়া খুন : ২ বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি :: মৌলভীবাজারের চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের ২ বছর হলেও মামলায় নেই কার্যকর অগ্রগতি। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, সহপাঠী, অভিভাবক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। গতকাল মানবজমিনের সঙ্গে আলাপে এমনটিই জানান সংশ্লিষ্টরা। দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নিজ দলের নেতাকর্মীদের হাতে খুন হওয়া ছাত্রলীগ নেতা মোহাম্মদ আলী শাবাব ও কর্মী নাহিদ আহমদ মাহি হত্যা মামলার বিচার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত শেষ হয়নি তদন্ত কাজ। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মৌলভীবাজার ব্রাঞ্চ। গেল ১ বছর থেকে এই মামলার তদন্ত কাজ করছে পিবিআই।

২০১৭ সালের ৭ই ডিসেম্বর গ্রুপিং দ্বন্দ্বে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের একই স্থানে ঘর থেকে মুঠোফোনে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয় ছাত্রলীগ নেতা ও মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের সম্মান ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আলী শাবাবকে। কোচিং থেকে বাড়ি ফেরার পথে ছাত্রলীগ কর্মী মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাহিদ আহমদ মাহিকে হত্যা করা হয়।

এ ঘটনায় নিহত শাবাবের মা সেলিনা রহমান চৌধুরী বাদী হয়ে মৌলভীবাজার মডেল থানায় ১২ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। কিন্তু মামলার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো এ হত্যা মামলার কার্যকর কোনো অগ্রগতি হয়নি। ক্ষোভের সঙ্গে এমনটিই জানাচ্ছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। জানা যায়, বাদীর নারাজির প্রেক্ষিতে মামলাটির তদন্তভার ন্যস্ত হয় পিবিআই’র ওপর। দায়িত্ব পাওয়ার পর গেল এক বছর থেকে এখনো তারা মামলাটি তদন্ত করছেন। আলোচিত এ জোড়া খুনের ঘটনায় শাবাবের পরিবার থেকে তার মা সেলিনা রহমান চৌধুরী বাদী হয়ে মামলা করলেও ওই খুনের ঘটনায় মামলাটির এরকম পরিণতি হবে জেনে মাহির পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ মামলা দায়ের করেননি। নিহত শাবাবের মা সেলিনা রহমানের অভিযোগ, আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরাফেরা করে তাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। নানা ভাবে হত্যার হুমকি ধমকিও অব্যাহত রেখেছে। এজন্য নিজের নিরাপত্তা চেয়ে মৌলভীবাজার মডেল থানায় তিনি জিডি করেছেন। জিডিতে তিনি প্রতিপক্ষ আনিসুল ইসলাম তুষারসহ ৭ জনের নাম উল্লেখ করে বলেন, শাবাব হত্যা মামলার এ আসামিরা হাজতে থেকে পরবর্তীতে জামিনে মুক্তি পায়। এর পর থেকেই তারা মোটরসাইকেলযোগে আমাকে প্রকাশ্যে হুমকি দেয়। তিনি তার ও তার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা চেয়ে চলতি বছরের ১২ই ফেব্রুয়ারি থানায় (জিডি নং-৭১৬) জিডি করে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কাছে নিরাপত্তার দাবি জানান। তিনি বলেন- তার পুত্র হত্যার পরিবেশ সৃষ্টিকারী হোতা ফাহিম মোনতাছিরকে আইনের আওতায় না এনে চার্জশিট দেয় পুলিশ। সমস্ত চার্জশিট এলোমেলো ভাবে দেয়ার কারণে মামলার তদন্তভার আদালত পিবিআইতে পাঠায়। মামলা তদন্তাধীন থাকা সত্ত্বেও আসামিরা আমাদের হুমকি দিচ্ছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন- তারা কার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এত বেপরোয়া হয়ে গেল? তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পুত্র হত্যার বিচার দাবি করেন। শাবাবের বাবা আবুবক্কর সিদ্দিক বলেন- পুত্র হত্যা মামলার এখনো কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখছি না।

রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে আসামি পক্ষের লোকজন প্রকাশ্যে চলাফেরা করছে। এক আসামি ইতিমধ্যে পালিয়ে বিদেশে চলে গেছে। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া আসামিকে দেশে আনা, যারা জামিনে আছে ও চার্জশিট থেকে বাদ পড়েছে তাদের সবাইকে তদন্তের মাধ্যমে সর্বোচ্চ বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান। তিনি বলেন- ওই দিন কে বা কারা ফোন করে শাবাবকে নিয়ে গেছে এই ঘটনা এখনো উদঘাটন হয়নি। পুলিশের তদন্তেও তা তুলে ধরা হয়নি। এই বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত করা হলে ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন হতো। শাবাব তার ফোনে কল পাওয়ার আধা ঘণ্টা পরেই তাকে হত্যা করা হয়। কিন্তু পিবিআই আজ এতদিন ধরে তদন্ত করছে কিন্তু ঘটনার কোনো রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। নিহত নাহিদ আহমদ মাহির মামা এমজি ইমরান আলী বলেন, আমরা ন্যায় বিচার পাবো না বলে মামলা দায়ের করিনি। শাবাবের পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলাটি এখনো পিবিআইতে আছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তো কোনো রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, নিহত ছাত্রলীগ নেতা শাহবাবের সঙ্গে ছাত্রলীগ নেতা তুষার গ্রুপের বিরোধের কারণেই তুষার শাবাবকে হত্যার চেষ্টা চালায়। শাবাব খুন হওয়ার ১০/১২ দিন আগে নিহত মাহির সঙ্গে তুষার গ্রুপের ফাহিমের ঝগড়া হয়। এই বিষয়টি মীমাংসা করার জন্যই ঘটনার দিন ৭ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় শাবাব ও মাহিকে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ছাত্রাবাস এলাকায় ডাকা হয়। সেখানে তুষার গ্রুপের নেতাকর্মীরা শাবাব ও মাহিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। এসময় ঘটনাস্থলে থাকা শাবাব ও মাহির বন্ধুরা ও পথচারীরা গুরুতর আহত শাবাব ও মাহিকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে পৌঁছালে কর্তব্যরত ডাক্তার অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন।

লোমহর্ষক এ হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ প্রায় ১ বছর পর আদালতে চার্জশিট দায়ের করেন মৌলভীবাজার মডেল থানার তৎকালীন ওসি সোহেল আহাম্মদ। তিনি তুষারসহ ১০ আসামিকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেন। কিন্তু বাকি দুই আসামিকে চার্জশিটের অন্তর্ভুক্ত না করায় বাদীর নারাজির প্রেক্ষিতে মামলাটি পিবিআইতে প্রেরণ করেন আদালত। নিহত শাবাব মৌলভীবাজার শহরের পুরাতন হাসপাতাল সড়ক এলাকার আবুবক্কর সিদ্দিক ও সেলিনা রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র। মাহি সদর উপজেলার কনকপুর ইউনিয়নের দুর্লভপুর গ্রামের বিল্লাল মিয়া ও জুলেখা বেগমের পুত্র। এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক (পিবিআই) মো. নজরুল ইসলাম ও পিবিআই মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম মুঠোফোনে জানান, মডেল থানার তদন্তে ১২ আসামিকে চার্জশিটভুক্ত করা হয়েছিলো। ওই চার্জশিট থেকে দুই আসামি বাদ পড়ায় বাদীর নারাজির প্রেক্ষিতে আমরা ওই দুই আসামি জড়িত আছে কিনা সেই বিষয়টি তদন্ত করছি। এ ছাড়াও অজ্ঞাত সন্দেহভাজন আরো ৬/৭ জন আসামি ওই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল কিনা তাও খতিয়ে দেখছি। তবে চার্জশিটের ওই ১০ আসামি ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে বলে জানান তারা। নিবিড় ও নিখুঁতভাবে তদন্ত করতে তদন্ত কাজে একটু বিলম্ব হচ্ছে জানিয়ে তারা বলেন- খুব শিগগিরই তদন্ত রিপোর্ট আদালতে পেশ করা হবে।

আরো পড়ুন : রাজনগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মিছবাহুদ্দোজা, সম্পাদক মিলন

সিলেটপ্রেসডটকম /০৮ ডিসেম্বর ২০১৯/ এফ কে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  

Send this to a friend