( স্মরণ)
বহুগুনের মানুষ ছিলেন মোস্তাফা নুরুজ্জামান

প্রকাশিত: ৩:০৮ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

<span style='color:#077D05;font-size:19px;'>( স্মরণ) </span> <br/> বহুগুনের মানুষ ছিলেন মোস্তাফা নুরুজ্জামান

জুলহান চৌধুরী :: ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বহু গুনি একজন মানুষের নাম মোস্তাফা নুরুজাজামান। জীবন কে দেখেছেন ও ভিন্নভাবে পরতে পরতে। বহু প্রতিভার অধিকারী এই মানুষ জীবন কে দেখেছেন বহুভাবে তিনি ছোট বেলা থেকেই সাহিত্য নিয়ে খেলা শুরূ করেন। আর সেই খেলার সাথী ছিলেন তার পিতা প্রয়াত আখতারুজ্জামান। তিনি ছিলেন একজন সরকারী কর্মকর্তা। পাশা পাশি তিনি ও বেশ ভালো কবিতা লেখতেন বলে জেনেছি।১৯৪৮ সালে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ফকিরপাড়া গ্রামে মুসলিম সম্ভ্রান্ত সুশিক্ষিত পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন কবি মোস্তাফা নুরুজাজামান।। তিনি ১৯৫৯ সালে কাসিম আলী হাইস্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র থাকা কালীন কবিতা আবৃতিতে অংশ নেন। আর সেই কবিতা তার বাবা লিখে দিয়েছিলেন তার নামে।

কবিতা টি ছিল : নুরুজ্জামান : নূতন দিনের আমি স্ববপ্ন

দেখি দিবস রাত
রূজ সকালে খোদার কাছে করি মোনাজাত
জন্ম দিয়েছেন স্রষ্ঠা মোরে করতে হবে নূতন কাজ
জপি সদা তাহার নাম আমার হৃদয় মাজ।
মানব রূপে জন্ম নিয়েছি করতে হবে নূতন কাজ
নব নব আবিস্কারে গড়বো নূতন তাজ।
এটা তার নাম দিয়ে লিখে দিয়েছিলেন তার প্রয়াত পিতা। তখন তার নাম শুধু নুরুজাজামান। তার নাম দিয়ে লেখা সেই কবিতা আবৃতিতে তিনি প্রথম হন। পরবর্তী বৎসর বগুড়া অধিবাসী বি.এস. সি শিক্কক বিদায়ী অনুষ্ঠানের অভিনন্দ পত্র ও লিখে দেন আখতারূজ্জামান।সেই অভিনন্দন পত্র লিখা ছিল কবিতার চরনে: আজি একি শুনি বাজে হেথা বিদায়ের বাশঁরী
তুমি বুঝি চলে যাবে আমাদের পাশরী
বিদায়ের ঘন ঘটা চারিদিকে কলোরোল
থামিয়েছে গান গাওয়া পাপিয়া ও বুলবুল।
স্যার, সালাম তছলিম জানাই বিদায় অভিনন্দন
তোমার গলে দেই ফুল প্রীতি চন্দন। ইত্যাদি
বেশ বড় কতক লাইনের লেখা” বিদায় অভিনন্দন” তার লেখা” আবার তোর্ মানুষ হ”
কাব্যগ্রন্থে তিনি তার হাতে খড়ি ও লেখালেখি ও আবৃতির কথা উল্লেখ করেছেন এভাবে।
চাকরি জীবন শেষ করতেই তার প্রয়াত স্ত্রী লুৎফা বেগমকে হারিয়ে বেশ শোকে বিহম্বল হয়ে পড়েন কবি।
বেশ চুপচাপ হয়ে যান তবে নিজেকে সমাজ সেবা থেকে গুটিয়ে নেননি। সব সময় একাকি ছিলেন তিনি কারন সংসার জীবনে তিনি কোন সন্তান পাননি। তবে তাদের সংসার খুব সুখের ছিল। তিনি সংসারের বড় ছিলেন। তাই ভাই বোন সবাই তার কাছে মানুষ হয়েছে।
এরপর ২০১৬ সালের প্রথম দিকে তিনি ব্রেন স্টোক করেন। দীর্ঘ দিন চিকিৎসা করলে কিছুটা কথা বলতেন এবং সেই অসুখেই তিনি
২০১৭সালের ১৭ নভেম্বর পৃথিবীর সকল মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমান সৃষ্টিকর্তার ডাকে যেখান থেকে কেউ ফিরে না।
আজ বড় মনে পড়ছে তাকে বড় অসময়ে চলে গেলেন কবি নুরুজাজামান। এই ক্রান্তিকালে তার বড়ই প্রয়োজন ছিল। তিনি চলে গেছেন ঠিকই কিন্তু রেখে গেছেন তার অসম ভান্ডার।
আজ বড়ই মনে পড়ছে তাকে তার মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তাকে দেখতে গিয়েছিলাম। কথা বোঝা যায় না তার পর ও অনেক কথা বলার চেষ্টা করেছেন। অনেক কিছু হয়তো বলতে চেয়েছিলেন। যা বোঝাতে পারেন নি, আমি ও সাথে ছিল বন্ধু সাংবাদিক রাজা। সেও উনার খুব প্রিয় ছিল।
১৯৬৪ সালে তিনি সিলেট সরকারী কলেজে পড়ার সময় তার শ্রব্দেয় ইংরেজী বিভাগের শিক্কক এ এইচ এম মোফাজ্জেল করিম সাহেবের রাষ্টদূত হয়ে বাহিরে চলে যাওয়ার সময় কলেজ ম্যাগাজিনে তার লেখা কবিতা “ কোন এক অনুঢ়াকে” কবিতাটি বেশ আলোচিত হয়েছিল বলে জানা যায়। মোফজাজেল করিম তাকে নিয়মিত লিখতে উৎসাহিত করে গেছেন।
আর সেই থেকে ই তিনি বিভিন্ন অনুষ্টানে তিনি জাতীয় দিবসে খবরের কাগজে তিনি লেখা লেখি শরূ করেন।
তিনি (১৯৬৯- ৭১) সালে ফেঞ্চুগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহ প্রধান শিক্কক থাকাকালীন বিভিন্ন বিভিন্ন অনুষ্টানে ছাত্রীদের বেশ কিছু কবিতা ও রচনা লিখে দেন যা বিভিন্ন সময় পুরুস্কৃত হয়েছিল। তিনি ১৯৭২ সালে শুরুতে পুথিঁর ছন্দে ব্যাঙ্গমুলক “ সহি এহিয়া নামা “ তার ছাত্রী গেণির কন্ঠে পরিবে্শন করে বে্শ সুনাম কুড়ায়।
১৯৭২- ৭৩ সালে তিনা বি,এ, ডি,সি – র অাঞ্চলিক হিসাব রক্ষক হিসাবে সুনামগঞ্জ চলে গেলে সেখানে ও তিনি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জড়িয়ে পড়েন।তৎকালিন ওস্তাদ গোপাল দওের ও অালা উদ্দিন খানের অনুপেরনায় তিনি বেশ কিছু গান লেখেন যা অন্যের নামে গোপাল দওে সুরে রেডিওতে প্রচার হয়।
১৯৭৩-৮০ সালে ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানায় সাংস্কৃতিক সংস্হা “ছায়ানীড় ” উদ্যেগে বেশ সাংস্কৃতিক অনুষ্টান হতো। তিনি সেই সংস্হার অর্থ সম্পাদক ছিলেন। তার সময় নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্টান হতো সিলেট থেকে শিল্পি আসতেন উচ্চাঙ্গ সংগীতের মরহুম ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ ও রাম কানাই দাস। সেই সময় এখান থেকে কুশিয়ারা নামে একটি সাহিত্য ম্যাগাজিন প্রকাশ হতো যাতে সারকারখানা ও ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকার কবি লেখকরা লিখতেন।
সেখান থেকে১৯৮১ সালে বদলি হয়ে চলে যান চট্রগামের চন্দ্রঘোনায় সেখানে উনিশটি বসন্ত কাটে কবির,। তবে সেখেন ও তিনি বসে থাকেন নি। অফিস ছুটির পরই চলে যেতেন মিশন হাসপাতালে বন্ধু গৌরা, কাঞ্চন,মংচিং,ডা: নারায়ন,রাজেশদের সাথে। অথবা কেপিএম এলাকার স্নেহভাজন শিল্পি হেলাল, লিপি,শিখা ত্রিপুরা,সাংবাদিক আবুল কালাম আজাদ, মোশারফ হোসেন প্রমুখ শিল্পিদের সাথে গান ও আবৃতিতে তিনি স্বর্গীয় সুধা পান করতেন। ১৯৯৯ সালে দেড় যুগ পার করে আবার নিজের ঘরে ফিরে আসেন কবি। তখন জাতীয় কবিতা পরিষদ সিলেট বিভাগীয় শাখার কবিতা জগতে তাকে জড়িয়ে ফেলেন এবং কবিতা পরষদের উপদেষ্টা বানান। সেই থেকে তিনি নিয়মিত কবিতা পরিষদে যাতায়াত ও কবিদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন।
জাতীয় কবিতা পরিদের সাধারন সম্পাদক কবি সমুদ্র গ্রপ্তের সাথে ছিল বেশ সখ্যতা। তিনি তাকে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশে উৎসাহ যোগান। প্রয়াত কবি সমুদ্র গুপ্ত তার বই প্রকাশে নিজ হাতে লিখে শুভ কামনা জানান।
কবি নুরুজাজামানেরর সাথে যারা মিশেছে তারাই কেবল তাকে চিনতে পেরেছে। তিনি কতটা উদার মনের মানুষ ছিলেন। তিনি দীর্ঘ চাকুরি জীবনে কখনো কোনদিন কোন অন্যায় কে মেনে নেননি। প্রশ্রয় দেননি অন্যায় কে। তিনি খুব নীতিবান মানুষ ছিলেন। যে কোন জায়গায় কোন অসংগতি দেখলে তিনি প্রতিবাদ করতেন। তিনি স্বাধীনতার শপথ কবিতা লিখেছেন : দিকে দিকে তাই অন্যায়, অত্যাচার/আর অনাচারের খেলা/ দেশ দশের কথা কেউ তো ভাবে না/ শুধু ছড়ায় বক্তৃতার মালা।তিনি ছোটদের ভাল মানুষ হবার পরামর্শ দিতেন।
তাইতো তার কাব্যগ্রন্থ ” আবার তোরা মানুষ হ’ তিনি লিখেছেন: ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তস্নাত হয়ে/নিয়েছিল নতুন শপথ/ দেশ গড়ার মানুষ গড়ার/ তথাপি বেহায়া বেশরমের মতো/ টিভির স্ক্রিনে আর সংবাদপত্রের পাতায় এসব পড়ে দেখে শুনে/ ঘরে বসে হায় হুতাশ আর আফসোস না করে/ একবার পুনরূঙ্থানের শিংগায় ফুক দাও- ওহে বিবেকবানরা /
ওদের স্নায়ুতে ইলেকট্রিক শখ দিয়ে বলো/
এসব বাদঁরামী রাখে
আবার তোরা মানুষ হ’।
কবি যথার্থ বলেছেন তিনি সদালাপি ও স্পষ্টবাদি ছিলেন, ছিলেন সত্য ও সুন্দরের পূজারী। আল্লাহ যেন তাকে তেমনি ভাবে কবুল করেন। আজ তার তৃতীয় মৃত্যু বার্ষিকীতে জানাই বিনম্রশ্রদ্ধা।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Send this to a friend