ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথ, সিলেটের সাথে যোগাযোগ বিপর্যয়

প্রকাশিত: ১১:৫৪ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৮, ২০১৯

ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথ, সিলেটের সাথে যোগাযোগ বিপর্যয়

শাহ শরীফ উদ্দিন, অতিথি প্রতিবেদক :: সকাল ৭ টায় সিলেট থেকে ঢাকাগামী কালনী এক্সপ্রেস ছাড়ার কথা, কিন্তু ৮ টা ২০ মিনিট হয়ে গেলেও ছাড়েনি ট্রেন। যাত্রীরা বগিগুলোতে উঠে নিজ নিজ আসন গ্রহণ করে অপেক্ষা করে করে বিরক্ত হলেও ট্রেন ছাড়ার কোন আভাস নেই। অতঃপর ৭ টার ট্রেন সাড়ে ৮ টায়ই ছাড়লো। হর্ন দিতে দিতেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো কালনী। ভোগান্তির এ দৃশ্যটি রোববার (১৭ নভেম্বর) সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের।

কালনী যেতে না যেতেই জয়ন্তিকার যাত্রীরা ভিড় জমান স্টেশনে। কারণ, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সকাল ৮ টা ৪০ মিনিটে জয়ন্তিকা ছাড়ার কথা। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হয়ে ৯ টা বেজে গেলেও জয়ন্তিকা ছাড়ার কোন লক্ষণ নেই। শুরু হয় যাত্রীদের হট্টগোল। কখন ছাড়বে? কেন দেরি হচ্ছে? ইত্যাদি প্রশ্ন। কিন্তু কে দিবে তাদের উত্তর! তেমন কোন সদুত্তর না দিলেও সহকারী স্টেশন মাস্টারের কক্ষের সামনে যখন যাত্রীরা হট্টগোল শুরু করেন তখন সকাল ১০ টার দিকে ছাড়তে পারে বলে জানালেন স্টেশন মাস্টার। অবশেষে ১০ টায়ই ছাড়া হলো জয়ন্তিকা।

তাহলে পাহাড়িকা ছাড়বে কখন? এমন প্রশ্ন আসতেই পারে। মোট কথা এক ট্রেন যেতে না যেতেই অন্য ট্রেনের যাত্রীরা স্টেশনে হাজির, আর অপেক্ষা। জয়ন্তিকার যাত্রীদের অপেক্ষা শেষ হলে শুরু পাহাড়িকার যাত্রীদের অপেক্ষা। পাহাড়িকা সকাল ১০ টায় ছাড়ার কথা থাকলেও যাত্রীদের এবার গাইতে হবে ‘স্টিশনের রেলগাড়িটা, মাইপা চলে ঘড়ির কাঁটা, প্ল্যাটফর্মে বইসা ভাবি কখন বাজে বারোটা’। এই গানটি। কারণ ১২ টা বাজলেই ছাড়বে পাহাড়িকা। কিন্তু এই গানকেও হার মানালো পাহাড়িকা। ১২টায়ও ছাড়া হলো না। তাহলে আর কোন গান আছে স্টেশনে বসে ট্রেন ছাড়ার অপেক্ষা নিয়ে? থাকলে সম্ভবত সেটিও গাইতেন যাত্রীরা। অবশেষে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ২ ঘন্টা ৪০ মিনিট বিলম্বে ১২ টা ৪০ মিনিটে ছাড়ে পাহাড়িকা। আর পারাবত ছাড়ে প্রায় ৩০ মিনিট বিলম্বে।

কেবল এক দিনের এ ভোগান্তিই নয়। সম্প্রতি ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের কসবা উপজেলাস্থ মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনের লুপলাইনের মুখে আন্তঃনগর উদয়ন এক্সপ্রেস ও তূর্ণা নিশীথার সংঘর্ষে ১৬ জন নিহতের ঘটনার পর থেকেই বিলম্বেই ছাড়ছে সকল ট্রেন। ফলে রেল যোগাযোগে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

অবশ্য এটাকে বিলম্ব না বলে ইঞ্জিনজনিত ত্রুটি বলছেন কর্তৃপক্ষ। অর্থাৎ অবিশ্বাস্য হলেও সত্য সকল ট্রেনের ইঞ্জিনেই ত্রুটি দেখা দিয়েছে। সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার মো. আফসার উদ্দিন বলেন, ‘ইঞ্জিনে সমস্যা হওয়ায় কাজ করতে হয়েছে। তাই সামান্য দেরি হচ্ছে।’

এক সাথে সবগুলো ইঞ্জিনেই সমস্যা? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কি আর বলব ইঞ্জিনগুলোত পুরনো হয়ে গেছে তাই এরকম হচ্ছে। একটা পর্যায় তেলের গাড়ির ইঞ্জিন দিয়ে জয়ন্তিকা ছাড়তে হয়েছে। মোগলাবাজার থেকে তেলের গাড়ির ইঞ্জিন এনে তার পর জয়ন্তিকা ছাড়া হয়েছে বলে জানান তিনি’।

তবে ট্রেন বিলম্বে ছাড়ার এ ঘটনাটি আজকেই না। ইদানিং প্রতিদিনই সকল ট্রেন বিলম্বে ছাড়া হচ্ছে বলে যাত্রীদের অভিযোগ।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সাদিয়া আঞ্জুম বলেন, দুর্ঘটনার পর থেকেই ট্রেন বিলম্বে ছাড়ছে। গতকালকেও আমার এক বান্ধবী ঢাকা গিয়েছে। সেও বলেছে তাদের ট্রেন প্রায় দেড় ঘন্টা দেরিতে ছেড়েছে। মূলত নানা অব্যবস্থাপনার কারণে এসব হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার মতে পুরনো নিয়মেই চলছে ট্রেন। এখানে জবাবদিহিতার বিষয় নাই, কোন অভিযোগ দেয়ার জায়গা নাই, যাত্রীদের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করার কোন চিন্তা নেই। তাই দিনদিন ট্রেনে অব্যবস্থাপনা দেখা দিচ্ছে, বাড়ছে দুর্ঘটনা।’

এদিকে সিলেটে সপরিবারে বেড়াতে এসেছিলেন কাইয়ম রাব্বি চৌধুরী। সাথে তার ৫ বছরের মেয়ে ও স্ত্রী। পাহাড়িকার অপেক্ষায় স্টেশনের প্লাটফর্মেই অপেক্ষমাণ। কথা হয় এ প্রতিবেদকের সাথে। তিনি বলেন, কখন ছাড়বে? কি সমস্যা তার কিছুই কেউ সঠিক করে বলতে পারছে না। স্টেশন ম্যানেজারের কাছে গেলে বলেন ইঞ্জিন সমস্যা। ঠিক হলে যাবে। কতক্ষণ লাগতে পারে জানতে চাইলে বলেন এটা লুকোসেট বলতে পারবে। অথচ লুকোসেট কি আমি নিজেও জানি না। মোট কথা তারা এক বিভাগ আরেক বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত না। জবাবদিহিতার জায়গা নেই। এক বিভাগ আরেক বিভাগের উপর দোষ চাপায়।

তবে লুকো মাস্টারদের বিশ্রামেরও প্রয়োজন থাকায়ও কিছু বিলম্ব হচ্ছে বলে জানালেন স্টেশন মাস্টার মো. আফসার উদ্দিন।

এদিকে লুকোসেটের এক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, সিলেট ঢাকা রেলপথ আগের তুলনায় অনেক ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় গতিসীমা অধিকাংশ জায়গায় ৪০ কিলোমিটারে। তাই ঢাকা থেকে সিলেটে ট্রেন আসতে দেরি হয়। এজন্য লুকো মাস্টারদের নির্ধারিত ৮ ঘন্টা বিশ্রাম না করে ট্রেন নিয়ে যেতে চান না।

ওই কর্মকর্তা আর জানান, রেলওয়ের নিয়ম অনুযায়ী একজন লুকো মাস্টার হেড কোয়ার্টারে হলে ১২ ঘন্টা আর হেড কোয়ার্টারের বাইরে হলে ৮ ঘন্টা বিশ্রামের সময় পায়। সে হিসেব অনুযায়ী একজন লুকো মাস্টার ৮ ঘন্টা বিশ্রাম করেই আবার ট্রেনে উঠবে। কিন্তু রেলপথ সমস্যার কারণে গতিসীমা কম থাকায় ট্রেন আসতে দেরি হয়। তাই তাদের নির্ধারিত বিশ্রামের জন্য সময় লাগে। আগে লুকো মাস্টাররা কম বিশ্রাম নিয়েই আবার চলে গেলেও সম্প্রতি ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর থেকে নির্ধারিত সময় বিশ্রাম না নিয়ে কেউ ট্রেন নিয়ে যেতে চায় না। এজন্যই বিলম্ব হচ্ছে। তাছাড়া ইঞ্জিনগুলোর অধিকাংশ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কারণে প্রায়ই সমস্যা দেখা দেয় বলেও জানান তিনি।

 

সিলেটপ্রেসডটকম /১৮ নভেম্বর ২০১৯/ এফ কে 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •