স্মরন
ছড়া জগতের সম্রাট কবি দিলওয়ার সিলেটের নক্ষত্র

প্রকাশিত: ১১:২২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০১৯

<span style='color:#077D05;font-size:19px;'>স্মরন</span> <br/> ছড়া জগতের সম্রাট কবি দিলওয়ার সিলেটের নক্ষত্র

জুলহান চৌধুরী :: শ্রদ্ধার সাথে স্মরন করছি সিলেটের কবি জগতের সম্রাট ছড়া জগতের রাজা গণমানুষের কবি দিলওয়ার কে। তার নামের হাজার বিশেষণ বল্লে ও কম হবে। তিনি একাধারে একজন গীতিকবি হিসেবে ও পরিচিত।কবি দিলওয়ার এমনই এক নাম যার সাথে পরিচয় রয়েছে সিলেটের। যেখানে প্রথম সূর্য্য উঠা দেখেন কবি ক্রীনবীজে

কবির সান বাধানো সুরমা পারের ঘাটে কবির কবিতার আলো ছড়াতে। আমরা অনেকেই সময়ে সময়ের আলো
দেখিনা। মূল্যায়ন করিনা তার কর্ম কে। ঠিক তেমনি কবি দিলওয়ার কে আমরা প্রথমার্ধে চিনতে ভুল করেছিলাম। কিন্তু কবি কে ঠিকই চিনেছিলেন সত্যজিত রায় সেই ১৯৬৪- ৬৫ সালে তার সম্পাদিত সন্দেশ পত্রিকায় তার ছড়া নিয়মিত ছাপা হতো। ছড়া জগতের রাজা দিলওয়ার যখন ছড়া লিখে দেশ বিদেশ কাপিয়েছেন তখন অনেক ছড়াকারের জন্ম হয়নি। কবি তার কবিতার সান পৌছে দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যালয় গুলোতে। কবির সাথে যারা মিশার সূযোগ হয়েছে তারা চিনতে পেরেছে এই ছড়া সম্রাট কে।
তিনি যে কত বড় মনের মানুষ তা তার সাথে যারা মিশেনি তারা ছাড়া কেউ বলতে পারবে না।

তিনি নি:সন্দেহে অনেক শক্তিমান কবি ছিলেন। তার সময়কার কবিদের মধ্যে তাকে প্রথম সারির কবিদের
মধ্যে অন্যতম। তিনি যে কোন স্হানে বসে যে কোন বিষয়ের উপর ছড়া বা কবিতা লিখেতে পারতেন।
এই খ্যাতিমান কবির জন্ম ১৯৩৭ সালের ১ জানুয়ারি সিলেটের ভার্থখলার খান মঞ্জিলে এক সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। স্কুল জীবন পেরিয়ে ভর্তি হন সিলেট এমসি কলেজে। সেখানেই প্রথম পরিচয় প্রফেসর মো: আব্দুল আজিজের সাথে(বর্তমান উপাচার্য, সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি) তিনি তিনি দেলওয়ার সংখ্যায় :অন্তরঙ্গ আলোকে : লেখেন মফ:স্বলের স্কুলের পাঠ চুকিয়ে শহরে নবাগত। ভর্তি হয়েছি স্বনামধন্য এম. সি কলেজে। চেনাজানার পরিধি তখন ও সীমিত। তাই সময় পেলেই চলে যেতাম পূর্ব পরিচিত আছদ্দর আলীর আস্তানায়। তিনি রাজনৈতিক কর্মি ছিলেন।তাছাড়া ও তার আরেকটি পরিচয় ছিল তিনি কবিতা লিখতেন। সেখানে তিনি কবি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন কবি দিলওয়ার কে। একজন প্রতিশ্রুতিশীল কবি হিসেবে।সহপাঠী থেকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে যাই আমরা কারন আইএতে আমার বাংলা অতিরিক্ত বিষয় ছিল। সে ক্লাশেই দিলওয়ার খানের সাথে পরিচয় থেকে অন্তরঙ্গ। কয়েক দিনের মধ্যে স্বাধীনতা সংখ্যা ‘নিশানা’ দিলওয়ারের কবিতা “একটি জবাব” বক্ষে ধারন করে প্রকাশিত হলো।

আর সেজন্য তিনি গণমানুষের কবি খেতাব ভূষিত হয়েছিলেন। তার প্রকাশিত গ্রন্হের তুলনায় অগ্রস্থিত কবিতা র সংখ্যা ও কম নয়। অপরিনত বয়সে ‘জিঞ্জাসা’ নামে (১৯৫৩) সালে কবিতার বই প্রকাশ হয়। প্রকাশক কবির বড় ভাই মুসলিম খান। “জিঞ্জাসা “ কবিতায় দিলওয়ার লিখেছেন –পৃথিবীতে এসে কেদে যায় যারা বেদনায় গেয়ে গান হতাশার কালো নয়নে মাখিয়া তপ্ত নিশ্বাস ফেলে
নত করি শির চরনে নিজের দু:খের পশরা ঠেলে
মহাজীবনের ললাটে আকিয়া তলোয়ার খরশান।
পংক্তিগুলো দিলওয়ারের যে জীবন জিজ্ঞাসা মূর্ত হয়ে ওঠেছে।

কবি দিলওয়ার যে ভাবেই চিন্তা করি কোন দিকেই তাকে ছাড় দেবার নয়, তিনি একাধারে কবি, ছড়াকার, গীতিকার। তিনি মরমী ধারায় কিছু গান, লিখেছেন পল্লিগীতি ও স্বদেশ প্রেমভিওিক। এসব গানের মাধ্যমে তিনি গনমানুষের নৈকট্য লাভ করেছিলেন। কবি দিলওয়ারের মোট গ্রন্হ সংখ্যা প্রায় দেড় ডজন। এর বেশিরভাগই স্হানীয় ভাবে প্রকাশিত। তার দ্বিতীয় গ্রন্হ ঐকতান (১৯৬৪) প্রকাশিত হলে প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সমালোচক প্রয়াত রনেশ দাস গুপ্ত মন্তব্য করেছিলেন ‘ তার মাটির ঘরে জনতার পায়ের চিহ্ন আছে।আর প্রয়াত অধ্যাপক কবীর চৌধুরী লেখেন- ঐক্যতানে দিলওয়ারের সমাজসচেতনতা বিশ্বের দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে একাত্নতা ও বলিষ্ঠ আশাবাদ মূর্ত হয়ে উঠে। লেখালেখিরক্ষেত্রে যে কোন বিষয়ে তাৎক্ষণিক কবিতা লেখার দক্ষতা নজরূলের পর দিলওয়ারের মধ্যে দেথা যায়। তার ছড়ার ছন্দে সেরকম ভাব ফুটে উঠে কেউ বলে আমি কবি খিওার/ সদরের পরগনে খিওার/ কতসুর বেজে উঠে গীত তার/ শতলাটি ঠোকাঠুকি – ঝনঝন।লেখনীতে তারই মায়া অঞ্জন।

কবি দিলওয়ারের ছড়ায় নতুন বৈচিত্র্য মাত্রা যোগ করেছে। তিনি লিখেছেন শিশুতোষ ঘুমপাড়ানি ছড়া, তেমনি
তেমনি বড়দের জন্য লিখেছেন ঘুম তাড়ানির উদ্দিপনাময় ছড়া। কবি নানা ভৌগলিক স্হানের নাম নিয়ে ছড়ার মালা গেথেছেন।তার আরেকটি পরিচয় তিনি একজন জনপ্রিয় গীতিকার। ১৯৬৩ সালে তার লেখা তুমি রহমতের নদীয়া “ গানটি দিয়ে সিলেট রেতার যাত্রা শুরু করেছিল। এর মধ্যে তার আরেকটি গান ছিল – “ মুর্শিদ আমি খোজবনা গো বন জঙ্গলে যাইয়। তবে যথই বলি কেন কবি দিলওয়ার ছিলেন প্রচার বিমুখ কথাটি সত্য। এবং আজীবন মফস্বলবাসী হওয়ায় তেমন প্রচারের আনুকুল্য লাভ করেননি।দেশের নামী দামি পত্র পত্রিকায় তার লেখা শেষ জীবনে খুব কম প্রকাশ হয়েছে।

তার পর কবি দিলওয়ার এদেশের গনমানুষের কবি তার কবিতায় এ দেশ , ভৌগলিক অবস্হান, সমাজ ব্যাবস্হা সব কিছু তার লেখনিতে তুলে এনেছেন সাবলিলভাবে। কবি হয়তো প্রথম জীবনের উপভোগ্য সময় রাষ্টের কাছে তেমন কিছু পাননি। তবে তাকে পশ্চিমবঙ্গের দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় তার আকাশবানীতে দিলওয়ার কে যথটুকু তুলে ধরেছিলেন সে তুলনায় দেশে তেমন কিছু হয়নি। তবে শেষ জীবনে তিনি রাষ্টিয় সম্মাননা পেয়ে গেছেন – তা কিছুটা হলে কবিকে তৃপ্ত করেছে। ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর কবি পৃথিবীর সকল মোহ ত্যাগ করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। পর পারে যেন তিনি শান্তিতে থাকেন যেন শান্তিতে থাকেন কবি। সেই কামনায় মৃত্যু বার্ষিকীতে জানাই বিনম্রশ্রদ্ধা।

লেখক : সাংবাদিক / কবি

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ