গোয়াইনঘাট সীমান্তে চোরাচালান বাড়ছে

প্রকাশিত: ১২:৪৮ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১, ২০১৯

গোয়াইনঘাট সীমান্তে চোরাচালান বাড়ছে

সিলেটপ্রেস ডেস্ক :: সিলেটের গোয়াইনঘাট সীমান্তে চোরাচালান বাড়ছেই। শুধুমাত্র এ উপজেলার সীমান্তের অন্তত ১০টি স্পট দিয়ে আসছে চোরাচালানের মালামাল। এক সময় অস্ত্র চোরাচালানের জন্য ব্যাপক আলোচিত এই সীমান্ত দিয়ে গত মাসে মোবাইল সেট, ঔষধের চালানও এসেছে। চোরাচালানের মালামাল বহনকারীরা কখনো আটক হলেও মূল চোরাকারবারীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা। সিলেট মহানগর পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জেদান আল মুসা সিলেটের ডাককে জানিয়েছেন, সম্প্রতি বেশ কয়েকটি চালানের মালামাল পুলিশ জব্দ করেছে। পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করেছে। চোরাচালানের মূল হোতাদের ধরতে পুলিশ মাঠে রয়েছে।
সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গোয়াইনঘাট উপজেলার বিছনাকান্দি নয়াবাজার, সোনারহাট এলাকার নয়াগাঁও, কুলুমছড়ারপাড়, ইসলামাবাদ, পান্তুমাই, প্রতাপপুর, তামাবিল, আমস্বপ্নপুর, নলজুড়ী ও সংগ্রামপুঞ্জি সীমান্ত দিয়ে অনেকটা অবাধে আসছে শুল্কবিহীন ভারতীয় চোরাই মালামাল। গত মাসে সিলেটে ৬টি চোরাচালানের মালামাল জব্দ করে পুলিশ। এর মধ্যে বেশিরভাগ মালামালই এসেছে গোয়াইনঘাট সীমান্ত দিয়ে। বিষয়টির ব্যাপারে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে সরকারের উচ্চ পর্যায়েও অবহিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যে মোবাইল সেটের চালান প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি সূত্র বলেছে, প্রভাবশালী চোরাচালানীরা প্রতি মাসে ২-৩ টি করে মোবাইল সেটের চালান সিলেটে নিয়ে এসে বিভিন্ন মোবাইল মার্কেটে পৌঁছে দেয়। এমনকি রাজধানীতেও ভারতীয় এই অবৈধ মোবাইল সেট পৌঁছানো হয়। সম্প্রতি এ রকম একটি চালান নিয়ে তুলকালাম কান্ড ঘটার পরই বিষয়টি সামনে আসে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ নভেম্বর বুধবার সকালে নগরীর চৌকিদেখী এলাকায় চেক পোস্ট বসিয়ে ভারত থেকে আনা ঔষধের চালান জব্দ করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। জব্দকৃত ঔষধের দাম ২৬ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। ১৩ কার্টুন ভর্তি চোরাচালানের ঔষধসহ কোম্পানিগঞ্জের দয়ারবাজারের আল-মারজান আবুলকে (২০) গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে, গোয়াইনঘাট-জৈন্তা সীমান্ত দিয়ে এই চালান আনা হয়। এই চালানের সাথে আরও লোক জড়িত বলে পুলিশ জানিয়েছে। শহরতলীর উমাইরগাঁও থেকে ২৬ নভেম্বর ৪২ হাজার পিস ভারতীয় পাতার বিড়িসহ জাকির হোসেন (৩০) নামের একজনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। ২৩ নভেম্বর শনিবার বিকেলে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সামন থেকে ভারতের তৈরি চকলেটের চালানসহ জুবায়ের আহমদ (৩২) নামের একজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ১৬ নভেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় নগরীর সুবিদবাজার এলাকার ফিজা এন্ড কোম্পানির ফ্যাক্টরির সামন থেকে ভারত থেকে চোরাচালানের মোবাইল সেটের চালান ছিনতাই করে নেয় ৪ যুবক। পরে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ৪ যুবকের একজন পুলিশের এ এস আই জাহাঙ্গীর হোসেন, অপরজন স্থানীয় একটি দৈনিকের স্টাফ রিপোর্টার মোশাররফ হোসেন খান ও তাদের ২ সহযোগী মিলেই মোবাইল সেটের চালানটি নিয়ে যায়। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ৪ জনকে গ্রেফতার করে। উদ্ধার করা হয় স্যামসাং, অপ্পো, ভিভো, শাওমিসহ বিভিন্ন কোম্পানির ২৭৯টি মোবাইল সেট। যার মূল্য প্রায় ৪১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। এ ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় পুলিশ বাদী হয়ে দু’টি মামলা দায়ের করে। মামলায় এই ৪ জন ছাড়াও এই চালানের মালিক জগন্নাথপুরের সৈয়দপুরের বাসিন্দা বর্তমানে নগরীর শামীমাবাদে বসবাসরত সৈয়দ আরিফ আহমদ ও মৃদুল নামের একজনকে আসামী করা হয়। ঘটনার পর থেকে আরিফ ও তার সহযোগীরা পলাতক রয়েছে।
মূলত, এ ঘটনার পরই মোবাইল সেটের চালানের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ঐ চালানে গোয়াইনঘাট সীমান্ত দিয়ে ৭০০ মোবাইল সেট এনেছিলেন সৈয়দ আরিফ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে চোরাচালানের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে মোবাইল সেট এনে করিম উল্লাহ মার্কেটসহ বিভিন্ন মার্কেটে সাপ্লাই দেন। এছাড়াও এই চক্রটি আরও মালামাল চোরাচালানের মাধ্যমে নিয়ে আসে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করে পুলিশ। ১৫ নভেম্বর শুক্রবার জৈন্তাপুরের ডিবির হাওর এলাকায় অভিযান চালিয়ে দেড় লাখ ভারতীয় রুপিসহ ইউসুফ মিয়াকে (৪০) গ্রেফতার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। সে সীমান্তে চোরাচালানের সাথে জড়িত বলে পুলিশ জানিয়েছে।
২৯ নভেম্বর শনিবার ভোরে সিলেট-তামাবিল সড়কের আইসক্রিম ফ্যাক্টরি এলাকা থেকে ভারতীয় সিগারেট ও নাসির বিড়িসহ জালাল উদ্দিন (৩০) নামের একজনকে আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। এ সময় তার সাথে থাকা ১০ কার্টুন নাসির বিড়ি, ১০ কার্টুন পিকক সিগারেট ও ১৫ কার্টুন জেট সিগারেট জব্দ করা হয়। জব্দকৃত বিড়ি ও সিগারেটের দাম প্রায় ১২ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সিলেটের বিভিন্ন স্থলবন্দর বা শুল্ক স্টেশন দিয়ে ভারতীয় মালামাল আমদানির পাশাপাশি বাংলাদেশি পণ্যও ভারতে রপ্তানী করা হয়। আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ আগের চেয়ে তুলনামূলক বৃদ্ধি পেলেও থেমে নেই চোরাকারবারীরা। শুধুমাত্র শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চোরাইপথে মোবাইল সেট, ঔষধ, কাপড়, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিসহ অন্তত শতাধিক পণ্য সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে নিয়ে আসা হয়। কাড়ি কাড়ি টাকার লোভে চোরাকারবারীরা নিয়মিত চোরাচালানের মালামাল নিয়ে আসছে।
বিজিবি সোনারহাট ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার নায়েক সুবেদার আনোয়ার সিলেটের ডাককে বলেন, আমাদের সীমান্ত দিয়ে কোনো মালামাল আসেনি। এগুলো সংগ্রামপুঞ্জি ও প্রতাপপুর সীমান্ত দিয়ে আসে। এজন্য বদনাম হয় সকল এলাকার।
বিজিবি প্রতাপপুর ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার নায়েক সুবেদার আইনুল বলেন, সীমান্ততো অনেক জায়গা। আমরা সবসময়ই পাহারা দেই। যাতে কোনো অবৈধ কিছু আসতে বা যেতে না পারে সেদিকেও কঠোর নজর থাকে। তবুও মাঝে মধ্যে হয়তো এসে যায়। তবে আমাদের নজরদারী বাড়ানো হয়েছে।
সিলেট মহানগর পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জেদান আল মুসা সিলেটের ডাককে বলেন, গত কয়েকদিনে কয়েকটি চালান পুলিশ আটক করেছে। মহানগর এলাকায় নিয়মিত চেকপোস্টের ফলে তা ধরা পড়ছে। বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়। মূল হোতাদের হন্যে হয়ে খুঁজছে পুলিশ। মোবাইলের চালানের আরিফকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, চোরাচালান প্রতিরোধে আইন শৃঙ্খলার পাশাপাশি জনসচেতনতারও প্রয়োজন।

 

সিলেটপ্রেসডটকম /০১ ডিসেম্বর ২০১৯/ এফ কে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ