সিলেটে চিকুনগুনিয়া আতঙ্ক ॥ ভাইরাস জ্বর ভয়াবহ নয়, প্যারাসিটামলই যথেষ্ট

 
 

1111নুরুল হক শিপু :: সিলেটে ভাইরাস জ্বর চিকুনগুনিয়া আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সিলেটে যে-জ্বরে সব বয়সের মানুষ এখন আক্রান্ত হচ্ছেন তা চিকুনগুনিয়া জ্বর নয়;-এমনটিই জানিয়েছেন সিলেটের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। একই সাথে ভাইরাস জ্বর হলে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলেও জানিয়েছেন।

সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডাক্তার দেবপদ রায় জানিয়েছেন, ‘জৈষ্ঠ্য ও আষাঢ় মাসে প্রতিবছরই ভাইরাস জ্বর দেখা দেয়। ভাইরাস জ্বর হলেই যে তা চিকুনগুনিয়া এমনটি নয়। চিকুনগুনিয়া ভাইরাস জ্বর মানুষের শরীরে না এটি মনে। চিকুনগুনিয়া গ্রামাঞ্চলের মানুষের হওয়ার কথা নয়। চিকুনগুনিয়া নয়; এখন অনেকেই ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত। আবহাওয়ার পরিবর্তনে এখন ভাইরাস জ্বর প্রতিবছরই হয়। তিনি বলেন, তাপমাত্রার ওঠা-নামার এই সময়ে ফ্লুর প্রকোপ বেড়ে যায়। ইতোমধ্যে অনেকে হালকা জ্বর, কাশি, নাকবন্ধ, গলা বসা, স্বর ভাঙা সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন। শরীরে ব্যথা ও ১০২-১০৩ ডিগ্রি জ্বরে ভুগছেন। এমন সমস্যায় আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, ভাইরাস অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়ার প্রয়োজন নেই। জ্বরে প্যারাসিটামল, গলা খুশখুশের জন্য গরম লবণ-পানি দিয়ে গরগরা করা কাজে লাগে। সঙ্গে চাই প্রচুর পানি ও তরল খাবার এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম।’

বিশেষজ্ঞদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, বছর ঘুরে আসে ঠান্ডা-গরম। ঋতু পরিবর্তন হলে প্রকৃতির নানা রূপ দেখা যায়। এসময় মানুষ নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। দেখা দেয় স্বাস্থ্যগত জটিলতা। বর্তমানে সেই সময়ই চলছে। তাই এখন ঘরে ঘরে ছোট-বড় অনেকে জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। ঋতু পরিবর্তনের ফলে বাতাসে আর্দ্রতার ওঠা নামার কারণে এখন জ্বরের প্রকোপ দেখা দিচ্ছে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ জ্বরের বেশিরভাগই ভাইরাসজনিত। আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তন এর প্রধান কারণ।

ভাইরাস জ্বরের অন্যতম লক্ষণ সম্পর্কে তাঁরা জানান, জ্বরের প্রায় ৭ দিন আগে থেকে একজন মানুষের শরীরে ভাইরাস আক্রমণ করে। এরপরই শীত-শীতভাব, কাঁপুনি, মাথা ও শরীর ব্যথা, হাত-পায়ের গিরায় ব্যথা, খাবারে অরুচি, নাক দিয়ে অঝোরে পানি পড়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া দেখা দেয়। অনেকের ক্ষেত্রে পেটের সমস্যা, বমি ও ডায়রিয়াও হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে টাইপ ‘বি’ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সংক্রমণে পেটব্যথাও হতে পারে। বাতাসের মাধ্যমে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি থেকেও ভাইরাস জ্বরের সংক্রমণ হতে পারে। ঠান্ডা লাগলে বা বৃষ্টিতে ভিজলেও ভাইরাস জ্বরের সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে।

ওসমানী হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ভাইরাস জ্বর হলে তেমন দুশ্চিন্তার কারণ নেই। এ জ্বরের জন্য কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের দরকার হয় না। জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল খেলেই হয়। তবে সপ্তাহ খানেকের বেশি সময় ধরে জ্বর দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক নাজমুল ইসলাম জানান, ‘ভাইরাস জ্বরটা মূলত আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে হয়ে থাকে। এটি চিকুনগুনিয়া কিংবা ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ নয়। তিনি বলেন, ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত রোগীরা প্রতিদিন হাসপাতালের বহির্বিভাগে সেবা নিচ্ছেন। এ জ্বরে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এটি স্থায়ী রোগ নয়। তিনি বলেন, এমন জ্বরে প্যারাসিটামলই যথেষ্ট।’

রাগীব রাবেয়া হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডাক্তার অর্চনা দেব জানান, ‘বর্তমানে আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে শিশুরা ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, এখনো আমাদের হাসপাতালে চিকুনগুনিয়া রোগে আক্রান্ত কোনো শিশু রোগী মেলেনি। সিলেটে এই রোগে কোনো শিশু আক্রান্ত হয়েছেন বলেও শোনা যায়নি। এটি স্রেফ আতঙ্ক। ঋতু পরিবর্তন ঘটলে শিশুরা মূলত ভাইরাস জ্বরে আক্রন্ত হয়। তিনি বলেন, আর্দ্র পরিবেশের কারণে শিশুরা রুটা ভাইরাস নামের ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তাদের জ্বরের সাথে ডায়রিয়া হয়। সেক্ষেত্রে মায়েরা খাবার তৈরির আগে ও পরে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে। রাস্তাঘাটের খাবার খাওয়ানো যাবে না। বাসি খাবার খাওয়া যাবে না। বড়দের জ্বর থেকেও শিশুদের ভাইরাস জ্বর হয়। এর কারণ সর্দি ও কাশি। বড়দের সর্দি কাশি হলে অবশ্যই রুমাল ব্যবহার করতে হবে। তিনি বলেন, এমন সময়ে শিশুরা মলত্যাগ করলে তাকে ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। মায়েদেরও ভালোভাবে হাত ধুতে হবে। জ্বরে শিশুরা আক্রান্ত হলে তরল খাবার, ডাবের পানি, লেবুর শরবত, স্যালাইন এবং বেশি করে পানি খাওয়াতে হবে। একই সাথে কুসুম গরম পানি দিয়ে শিশুর গা মুছে দিতে হবে।’