সব কারখানা ঝুঁকিমুক্ত করা প্রয়োজন

 
 

343344

ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান

২৪ এপ্রিল ২০১৩ সারা পৃথিবীর শ্রমিক শ্রেণির জন্য মর্মান্তিক দুঃখের দিন। ভয়াবহ এই কালো দিনটিতে সাভারে রানা প্লাজার ৯ তলাসহ ভবনটি সম্পূর্ণ ধসে পড়ে প্রাণ হারায় এক হাজার দুই শর বেশি নারী-পুরুষ শ্রমিক। মারাত্মক আহত হয় আরো দুই হাজার ৫০০ শ্রমিক। খোঁজ মেলেনি অনেকের।

রানা প্লাজার এ দুর্ঘটনা প্রকৃতপক্ষে আমাদের দেশ তথা সারা বিশ্বের মেহনতি মানুষের জন্য ওয়েক-আপ কল। রানা প্লাজা ভবনটিতে ভয়াবহ ফাটল ছিল। এই ফাটলের ব্যাপারে ভবন ধসের আগের দিন সাভারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এসে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। কিন্তু কারখানার মালিকদের খামখেয়ালিপনা এবং বিল্ডিং কোড না মেনে নির্মিত ভবনটির মালিকের দস্যিপনায় ভবনটি নিয়ে যে ইতিহাস রচিত হলো, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী শ্রমিকদের আতঙ্কিত করে রাখবে। ভবনটিতে সাত-আটটির বেশি গার্মেন্ট কারখানা ছিল, যেখানে প্রতিস্থাপিত হয়েছিল অজস্র ভারী যন্ত্রপাতি। সকালে ভবনটিতে ফাটল দেখে ঝুঁকিপূর্ণ ভেবে শ্রমিকরা কাজে যেতে চায়নি। মালিকপক্ষের লোকজন ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক সবাইকে ভবনে ঢুকিয়ে তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। রানা প্লাজা ধসে প্রমাণিত হয়, এই প্রযুক্তির যুগে শুধু মুনাফা অর্জনের লোভে মালিকরা শ্রমিকদের জীবন, শ্রম, রক্ত ও প্রাণের প্রতি ধারাবাহিকভাবে উদাসীনতা দেখিয়ে চলেছে।

এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পরও নিহত ও আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টিও স্বস্তিদায়ক নয়। দীর্ঘসূত্রতার পর আমাদের দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর ত্রাণ তহবিল থেকে এবং পরবর্তী সময়ে আইএলওর মাধ্যমে ব্র্যান্ড ও বায়ার দুই লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা নিহত ও আহত শ্রমিকদের প্রদান করেছে। নিহত শ্রমিকের পরিবার ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ হিসেবে পেয়েছে।

চিরতরে পঙ্গুত্ববরণকারী এবং মারাত্মক আহত শ্রমিকদের যে হারে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে, তা যেমন পর্যাপ্ত নয়, তেমনি তাদের সুচিকিৎসাও প্রদান করা হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি আহতদের সুচিকিৎসার পাশাপাশি পর্যাপ্ত আনুষঙ্গিক প্রতিকারের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। আমরা মনে করি, সে ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের একটি স্থায়ী মানদণ্ড থাকা উচিত। শ্রম আইন অনুযায়ী বর্তমানে যে ক্ষতিপূরণের কথা বলা হয়েছে, তা আগের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। প্রায় ১০ বছর আগে যে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা এক লাখ থেকে দুই লাখ করা হয়েছে, যা বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সম্পূর্ণ অপ্রতুল। এ ক্ষেত্রে শ্রমজীবী মানুষের দাবি, আইএলও কনভেশন ১২১-এর ভিত্তিতে ‘লস অব ইয়ার আর্নিং’ হিসাব করে যখন যে শ্রমিক নিহত হবেন, তখন তাঁর অবসরকালীন সময় পর্যন্ত শ্রমকালীন হিসাব এবং মানসিক যন্ত্রণা যুক্ত করে ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে, যেটা কালে কালে পরিবর্তনযোগ্য। বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলা এই বিপর্যয়ের পর গার্মেন্টশিল্পের ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন অষষরধহপব ও অপপড়ত্ফ বাংলাদেশের গার্মেন্ট কারখানার ভবন নির্মাণপ্রক্রিয়া, অগ্নিনির্বাপণ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, শ্রমিকদের নিরাপদ বহির্গমন পথ, মূল সমস্যা শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক ইত্যাদির ওপর জুলাই ২০১৩ থেকে জুলাই ২০১৮ পর্যন্ত  Alliance এবং মে ২০১৩ থেকে মে ২০১৮ পর্যন্ত Accord পর্যবেক্ষণ, সুপারিশ ও বাস্তবায়নমূলক কাজ করছে। নিশ্চয়ই তাতে আমাদের পোশাকশিল্পে ইতিবাচক কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, দেশে বৃহৎ গার্মেন্টশিল্পের বাইরেও অনেক ছোট ছোট গার্মেন্ট আছে, যেগুলো সাব-কন্ট্রাক্টে মূল কারখানার জোগান দেয়। সেসব কারখানা যথাযথ তদারকি বা পরিদর্শনের বাইরে থেকে যাচ্ছে। সেখানে ঝুঁকি নিয়ে অজস্র শ্রমিক কাজ করে যাচ্ছে। সেসব কারখানার ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষতির প্রতিকার করা হচ্ছে কি না তা নজরদারির বাইরে রয়ে যাচ্ছে। প্রচলিত আছে, অষষরধহপব এবং অপপড়ত্ফ তাদের তথ্য অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে কাজের উপযোগী কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সংস্থা দুটি চলে যাওয়ার পর সরকারি নজরদারি প্রতিষ্ঠান যথাযথভাবে ধারাবাহিকতা বহাল রাখছে কি না, সেদিকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বড় ধরনের বিপর্যয় রোধ, নিরাপদ কর্মস্থল, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরিচর্যা এবং শ্রম হারে নিশ্চয়তা বিধান করতে কারখানা পর্যায়ে পার্টিসিপেটরি কমিটির মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয়ভাবে মিটমাটের যে শর্ত আছে, মালিকদের অবজ্ঞার কারণে সেই কমিটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। রানা প্লাজার শ্রমিকদের সংগঠিত শক্তি বা ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার উপেক্ষিত ছিল। ফলে শ্রমিকরা কোনো প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি, যার মাসুল গুনতে হয়েছে এক হাজার ২০০ শ্রমিককে তাঁদের মূল্যবান জীবন দিয়ে।

আজও ইপিজেডসহ বহু কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম গড়ে ওঠেনি, যার ফলে শ্রমিকদের সমস্যার সমাধানের সব পথ রুদ্ধ হয়ে আছে। আমরা মনে করি, শিল্পের বিকাশ এবং উদ্ভূত সংকট নিরসনে কার্যকর ট্রেড ইউনিয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মালিকদের অনীহা ও অহংয়ের কারণে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে উঠতে পারছে না। বর্তমান শ্রম আইন অনুযায়ী যেটুকু অধিকার শ্রমিকদের আছে, তা একদিকে যেমন আইএলও কনভেনশন ’৮৭ ও ’৯৮-এর পরিপন্থী; অন্যদিকে মালিকদের অনীহার কারণে ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে ‘আঁতুড় ঘরে শিশুর মৃত্যু’ পর্যায় পরিলক্ষিত হচ্ছে। এটি শিল্পশ্রমিক স্বার্থে (Industrial relation) কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। আমরা মনে করি, শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে এবং শিল্প বাঁচলে দেশ বাঁচবে। এই প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত হওয়া অপরিহার্য।

গার্মেন্টশিল্পে বৈদেশিক ক্রেতা এবং  supply পযধরহ-গুলোর ভালো রকম সক্রিয়তা লক্ষ করা যায়। সে জন্য আমাদের গার্মেন্টশিল্পের বিকাশ এবং স্থিতির প্রশ্নে তাদের দায়বদ্ধতা প্রতিপালনের বিষয়টি ভাবতে হবে। তাদের মালিকদের সংজ্ঞায় নিয়ে আসতে হবে, কারণ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে তারা একটি বড় অংশীদার। এমনটা হলে কারখানা ও শ্রমিক উভয় ক্ষেত্রই উপকৃত হবে।

রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে। ভবন মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা চলছে। সুস্পষ্ট প্রমাণাদির পরও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তি আরোপিত হয়নি। গার্মেন্টশিল্পে সংঘটিত এর আগের কিছু ভয়াবহ দুর্ঘটনাও অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তি পেতে দেখা যায়নি। এই অবহেলায় অসময়ে জীবন যায় অজপাড়াগাঁর শ্রমজীবী ভাই-বোনদের। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পঞ্চম বর্ষে এসে তাই বলতে চাই, সময় থাকতে সব কারখানা ঝুঁকিমুক্ত করা প্রয়োজন।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র