রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিরাপত্তার হুমকি : আল-আমিন

 
 

Al Amin Picরোহিঙ্গা সমস্যাটি কোনো সাময়িক মানবিক বিপর্যয় নয়। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় চলে আসা মিয়ানমারের জান্তা সরকারের পরিকল্পিত বৈষম্যমূলক আইনের মাধ্যমে বংশপরম্পরায় বসবাসরত আরকানি রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে তাদের অধিকারহীন জনগোষ্ঠীতে রূপান্তর করার সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত। শান্তিতে নোবেল পাওয়া অং সান সু চি এবং তার রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করলেও সেই বৈষম্যমূলক নীতির কোনো পরিবর্তন ঘটাননি। বরং তিনি জান্তা সরকারের সাথে মিলে আরকান রাজ্যের মুসলিম রোহিঙ্গাদেরকে নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা, ধর্ষণ করে হত্যা করার সমর্থন দিয়েছেন।

এই অমানবিক নির্যাতন অত্যাচার, হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণের মুখে জীবন বাঁচাতে মিয়ানমারের সীমান্ত নাফ নদী পাড় হয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা করেছিল। আর এই রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছিল বিজিবি ও কোষ্টগার্ড সদস্যদের। অবশেষে মানবিক দিক বিবেচনা করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা এই রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদেরকে বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়েছেন। ফলে ৮ লক্ষ মুসলিম রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এখনো নাফ নদী পাড়ি দিয়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিচ্ছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় কেন্দ্রে গিয়েছেন, তাদের খোঁজ খবর নিয়েছেন, তাদের সাথে কথা বলেছেন। তিনি আওয়ামী লীগের প্রধান হয়ে কক্সবাজারের টেকনাফ কুতুবপালং উখিয়ার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশে ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে দাঁড়াতে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি দেশের বিত্তশালীদের এবং সামাজিক সংগঠনের প্রতি আহ্বান করে বলেছেন, যে যার সাধ্যমত ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে যেন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। কারণ তিনি অংসান সুচির মতো কালপিঠ নয়, জান্তা সরকারের মতো পিছাস নয়। তিনি মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা, বঙ্গবন্ধুর মতোই উদার মনের পরিচয় দিয়েছেন।

সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ওআইসি এবং জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বিশ্ব নেতাদেরকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করার জন্য আহ্বান করেছেন এবং বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে ‘হিউম্যানিটি অব মাদার’ উপাধি পেয়েছেন। জাতিসংঘের অধিবেশনের এক ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। তিনি শেখ হাসিনার কাছে জানতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশ কেমন আছে। বাংলাদেশের মানুষ কেমন আছেন। শেখ হাসিনা তার জবাবে বলেছিলেন, বাংলাদেশ ভালো আছে, বাংলাদেশের মানুষ ভালো আছেন। তিনি রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে কোনো সহযোগিতা চান নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বুঝতে পেরেছিলেন রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশকে কোন সহযোগিতা করবেন না। তিনি এ কাজে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে উচুঁ করেছেন।

দুই
মিয়ানারের উগ্র মৌলবাদী বৌদ্ধদের নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত প্রায় ৮ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে। এর সংখ্যাটা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা খুবই উদ্বেগজনক। আর মিয়ানমার যে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের খুব সহজেই ফিরিয়ে নিবে এমনটাও নয়। কারণ যেখানে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের সে দেশের নাগরিক হিসেবেই স্বীকার করে না। নিজ দেশে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গাদেরকে সেনাবাহিনী দ্বারা নির্যাতন করে বিতাড়িত করে, সেই দেশে বাংলাদেশের শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করা কতটুকু সম্ভব ?

রোহিঙ্গা ইস্যুটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও বাংলাদেশ এই সমস্যার সঙ্গে জড়িত। মানবিক দিক বিবেচনা করে এর আগে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে এবং এখনো দিচ্ছে। কিন্তু এখন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের সক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশ এমনিতেই নিজের জনসংখ্যা চাপে ন্যুজ্জ্ব। নিজেদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে হিমশিত খেতে হয়। এর মধ্যে বছরের পর শরণার্থীদের বাড়তি চাপ সহ্য করা কতটুকু যৌক্তিকতা? বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিষয়টাও ভাবতে হবে। দেশে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। রোহিঙ্গাদের অনেকেই মাদক ব্যবসা, ইয়াবা ব্যবসা ও চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত। এমন খবর আমরা গণমাধ্যম মারফত জানতে পেরেছি। যা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। রোহিঙ্গাদের ভরণ-পোষণের কারনে এদেশের অর্থনীতির ওপর প্রভাব পড়ছে। ‘যদি ৮ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করে থাকে তাহলে একজন রোহিঙ্গার প্রতি দিনের তিন বেলার খাদ্য মূল্য ১’শ টাকা হলে প্রতিদিন দাড়ায় ৮০ লক্ষ টাকা। অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতিদিন সর্বনিম্ন ১ কোটি টাকা রোহিঙ্গাদের পেছনে খরচ হচ্ছে। যা আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জন্য বিরাট চাপ।’

তিন
সবে মাত্র বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পা দিয়েছে। এখনো অভ্যন্তরীণ সংকট সমাধান হয় নি। বাংলাদেশকে বন্যা, জ্বলোচ্ছাসের মতো প্রাকৃতিক দূর্যোগের মোকাবেলা করতে হয়। বেকারত্বের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পারছে। নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বড় বড় কাজ সম্পন্ন করছে। এরই মধ্যে বিপুল সংখ্যক রাখাইন মুসলিম জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্র্রয়, তাদের ভরণ পোষন, স্বাস্থ্য, শিক্ষার চাহিদা মিটানো সহজ কাজ নয়। এই অবৈধ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীরা তাদের চাহিদা পূরণ করার জন্য বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে। সন্ত্রাসী, ছিনতাই, চুরি, মাদকদ্রব্য পাচার, ইয়াবা পাচার চোরাচালানসহ বিভিন্ন ধরণের অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। তারা মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় অপরাধ চক্র তৈরী করে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, জাতীয় পরিচয় এবং এই অঞ্চলের শ্রম বাজার ও কর্মসংস্থানের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এতে বাংলাদেশের সামাজিক অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ক্ষতি হবে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ নিরাপত্তার হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

চার
মিয়ানমার সরকার চায় রোহিঙ্গাদের দায় সব সময়ের জন্য বাংলাদেশের কাঁধে চাপিয়ে দিতে। মিয়ানমারের শাসক গোষ্ঠী রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশী হিসেবে আখ্যায়িত করে বিভিন্ন সময় বক্তব্য দিয়ে থাকেন। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ভাষা, ধর্ম, নৃতাত্ত্বিক গঠনে বাংলাদেশের টেকনাফ কক্সবাজার অঞ্চলের মানুষের সাথে মিল খুজে পেয়ে বার বার বলে থাকেন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে বংশদূত। এখন বাংলাদেশের উচিত রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে যত সম্ভব মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। অথবা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নীতি কারো সঙ্গে শত্র“তা নয়, মিত্রতা। সেই মিত্রতার মাধ্যমেই আন্তর্জাতিকভাবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করতে হবে। কারণ শেখ হাসিনার সরকারই মিয়ানমারের সাথে সীমান্তে চোরাচালান, সমুদ্রসীমা নির্ণয়, আন্তর্জাতিক আদালতে সমুদ্রসীমার হিস্যা বাংলাদেশের পক্ষে নিয়ে আসার মতো কঠিন কাজটি করেছেন। তাই বাংলাদেশ মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যেন নষ্ট না হয়। সেদিকে সতর্ক থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করতে হবে। অদূর ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে নিরাপত্তার হুমকি থেকে বাঁচাতে হবে।
লেখক : বি.এস.এস (অনার্স), এম.এস.এস (অর্থনীতি)