মাদকের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে

 
 

1513

মীর আব্দুল আলীম :: দেশে ইয়াবা এখন মুড়িমুড়কির মতো বিক্রি হচ্ছে। ইয়াবার ব্যবহার ও বিক্রি বাড়ছে ব্যাপকহারে। সর্বনাশা এ মাদকের মরণ ছোবল দেশের সম্ভাবনাময় যুব সমাজকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়াবা হেরোইনের চেয়েও ক্ষতিকর। এটা এক ধরনের মনোউত্তেজক মাদক। ইয়াবা সেবনের ফলে সাময়িক শারীরিক উদ্দীপনা বাড়লেও কমতে থাকে জীবনীশক্তি। এর ফলে খুব দ্রুত আসক্তরা আক্রান্ত হয় দুরারোগ্য সব ব্যাধিতে। আর এর সঙ্গে সামাজিক ও পারিবারিক বহুবিধ নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি তো রয়েছেই।

এখন সরকারি হিসেবেই দিনে সেবন হয় ২০ লাখ ইয়াবা বড়ি। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে স্রোতের মতো ইয়াবা ঢুকছে বাংলাদেশে। যেখানে ২০১০ সালে ৮১ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট আটক হয়েছিল, সেখানে ২০১৬ সালে আটকের সংখ্যা দাঁড়ায় তিন কোটি। মিয়ানমারের বিদ্রোহী ও কিছু অপরাধী গোষ্ঠী ইয়াবা বিস্তারের প্রধান রুট করেছে বাংলাদেশকে। তিন কোটি ইয়াবা আটক হলে বছরে কতো কোটি ইয়াবা আসে বাংলাদেশে? ধারণা করা হয়, বছরে কেবল বাংলাদেশে বিক্রিত ইয়াবার দাম আসে ২১ হাজার ৬শ’ কোটি টাকা। এক দিনেই মিয়ানমার বিক্রি করছে ৬০ কোটি টাকার ইয়াবা।

উন্নত বিশ্বও কিন্তু মিয়ানমারকে ইয়াবা উত্পাদন বন্ধে চাপ দিচ্ছে না। এ কারণেই আমাদের সন্দেহ যে বাংলাদেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য এটা কোনো ষড়যন্ত্র নয় তো? এক দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রতিবছর গড়ে সাড়ে ছয় শতাংশ হারে বাড়ছে। ২০১৬ সালে মোট অভ্যন্তরীণ উত্পাদন রেকর্ড ৭.০৫ শতাংশ বাড়ে। চলতি বছর আরও বাড়বে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। সমস্যাটা এখানেই। মিয়ানমারের ইয়াবা বাংলাদেশে আসাটা সহজ নয় বরং তা আন্তর্জাতিক কৌশল হতে পারে। বাংলাদেশে ইয়াবা সমস্যার পেছনে ষড়যন্ত্র আছে অবশ্যই। তারা আমাদের দেশের ক্ষতি করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমাদের জনসংখ্যার পাঁচ কোটি তরুণ-তরুণী। এদের স্বাস্থ্য ও কর্মশক্তিকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ওরা। আর আমাদের যুব সমাজ ধ্বংসে তাদের ষড়যন্ত্রে সাহায্য করছি আমরা। মাদকের সাথে প্রশাসনের সম্পৃক্ততার কথা তো শুনি হরহামেশাই।

পাশের দেশ মিয়ানমারের গুটির চালে গোটা বাংলাদেশ তছনছ হয়ে যাচ্ছে। ইয়াবা নামক এই মরণনেশার দংশনে নীল সারা দেশের লাখ লাখ তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রতিদিনই এ নেশার জগতে পা বাড়াচ্ছে নতুন নতুন মুখ। বাংলাদেশ লাগোয়া মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় ইয়াবা তৈরি হচ্ছে অন্তত ৪৬টি কারখানায়। মিয়ানমারের শান ও ওয়া রাজ্য থেকে মরণ নেশা ইয়াবার কাঁচামাল ইয়াংগুন হয়ে রাখাইন রাজ্যের সিটওয়ে ও মংডুতে পৌঁছে। এসব কারখানার মধ্যে ১০টি গড়ে উঠেছে মংডু এলাকায়ই। এখন নাফ নদী পার হয়ে নৌযানে ইয়াবার চালান চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে। মাদক ও অপরাধ নির্মূল বিষয়ক জাতিসংঘ কার্যালয়ের (ইউএনওডিসি) ২০১৫ সালের প্রতিবেদনে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে মিয়ানমারের ইয়াবা কারখানাগুলোকে। মাদকের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় কমিটিকে (সিসিডিএসি) ইয়াবা কারখানার তালিকা দিয়ে প্রতিকার চাইছে বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। তবে কারখানা বন্ধে কোনো উদ্যোগ নেয়নি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে একটি তালিকায় মিয়ানমারকে ৪৫টি ইয়াবা কারখানার ব্যাপারে তথ্য দেয় বাংলাদেশ। তবে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে, এসব কারখানার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এমন অবান্তর কথাই মিয়ানমার বারবার বাংলাদেশকে জানাচ্ছে। অথচ মিয়ানমারে সোর্স দিয়ে তল্ল­াশি চালায় এদেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। এতে ৪৫টি কারখানার তথ্য প্রমাণ মেলে। প্রতিটি কারখানা থেকে বাংলাদেশে নিজস্ব সিণ্ডিকেটে ইয়াবা আসে। এসব ইয়াবা অনুুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে।

একটি প্রজন্ম ধ্বংস হওয়ার আগে আমাদের সবার দায়িত্ব হবে দেশ থেকে মাদক নির্মূল করা। এজন্য দেশের সবাইকে যে যার জায়গা থেকে মাদকের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, রাষ্ট্রের চেয়ে মাদক সিন্ডিকেট মোটেও শক্তিশালী নয়। রাষ্ট্র চাইলে দেশের মাদক প্রসারতা কমতে বাধ্য। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কঠোর হতে হবে। মাদকাসক্তদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর সেবামুখী কার্যক্রম জোরদার করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: গবেষক

উৎস: ইত্তেফাক