পরীক্ষার ফাঁস এবং প্রশ্ন ফাঁসের নানা নিয়ামক

 
 

546546

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ

বিশ্বে বাংলাদেশ সম্ভবত অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে জানুয়ারির প্রথম দিন উত্সব করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ করে। নানা প্রতিকূলতার পরও দুদিন আগে শিক্ষামন্ত্রী জানালেন এবারও সরকার প্রস্তুত। পর্দার এই পিঠটা আমাদের জন্য গর্বের এবং আশা জাগানিয়া। কিন্তু অপর দিকটি ভয়ঙ্কর হতাশার এবং মর্মান্তিক পতনের। স্কুলশিক্ষার পুরো কাঠামোটিতে পড়ছে বিষাক্ত অক্টোপাসের থাবা। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে আশঙ্কার সঙ্গে ভাবি আগামীর ইতিহাস লেখক এসময়ের বৈপরিত্যকে ব্যাখ্যা করবেন কোন আঙ্গিকে? যে-দেশের সরকার বিনামূল্যে কোটি কোটি পুস্তক বিতরণ করার সাফল্য দেখাতে পারছে সে-দেশের সরকার পরাস্ত হচ্ছে প্রশ্ন ফাঁসকারী আর গাইড, নোট ও কোচিংঅলাদের কাছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস, বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস, এসএসসি আর এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস দেখে-শুনে যখন ক্লান্ত তখন আবার দেশের শিশুদের সুশিক্ষিত বানানোর নতুন মহড়া পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনাও ঘটতে লাগলো। মনকে সান্ত্তনা দিতে থাকলাম এই বলে যে এতসব গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার আভিজাত্যের সঙ্গে না হয় ‘প্রশ্ন ফাঁস’-এর সংস্কৃতি অনিবার্য হয়ে গেছে— কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভর্তি, চাকুরি এবং মূল্যবান সার্টিফিকেট অর্জনের বেলায় না হয় এই ফাঁস সংস্কৃতির সংশ্লিষ্টতা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু অতি সম্প্রতি প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির শিশুদের বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নও ফাঁস হওয়া শুরু হয়েছে। অবক্ষয়ের আর বাকি রইলো কী! এখন এত সব ফাঁসের মহোত্সব দেখে ‘আইনের হাত লম্বা’ এবং ‘সরকারের হাত লম্বা’ বাক্যগুলো নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ তৈরি হয়েছে। কতটা অসহায়ত্বের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পড়েছে যে এতসব প্রশ্নফাঁসের কারণ হিসেবে দুদক দোষ চাপাচ্ছেন সরকারি প্রেস, মন্ত্রণালয় ও অসাধু কর্মকর্তাদের ওপর আর শিক্ষামন্ত্রী সরাসরি দোষী হিসেবে সাব্যস্ত করছেন অসাধু শিক্ষকদের। ধরে নিলাম দুই পক্ষের সিদ্ধান্তই ঠিক। কিন্তু উভয় পক্ষ দোষারোপ করায় সাফল্য দেখাতে পারলেও প্রতিবিধানের জায়গায় সকলেই অসহায় কেন? আলোকিত উত্সবে বিনামূল্যে বই বিতরণের পর যে তমসা রেখার বিস্তার ঘটছে এর ব্যাখ্যা কী হতে পারে?

এক স্কুল শিক্ষক ক্ষোভের সঙ্গে বললেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অপরাধীদের মূলোত্পাটন করতে গিয়ে যদি নিরপেক্ষ আর নির্মোহ হতে না পারে তবে এ রোগ প্রথম শ্রেণি থেকে এবার আঁঁতুড় ঘরে গিয়ে পৌঁছবে। ক্ষুব্ধ শিক্ষক বললেন, স্যার, এখন তো ওপেন সিক্রেট যে নোট, গাইড আর সহপাঠঅলারা স্কুল-কলেজ কেনেন। অর্থাত্ টাকার বিনিময়ে স্কুলের তালিকায় ঢুকে যায় নির্দিষ্ট নোট-গাইড বইয়ের নাম। এভাবেই কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর শিক্ষকের সঙ্গে নোট-গাইড ও সহপাঠ বইয়ের প্রকাশকদের একটি বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি হয়। এ রকম আর্থিক স্খলন যখন বিবেককে নষ্ট করে দেয় তখন অর্থের বিনিময়ে প্রশ্ন ফাঁস করার অপরাধ এদের ছুঁয়ে যায় না। গাইড, নোট, কোচিং ব্যবসা বন্ধে কতবার কত সরকারি সিদ্ধান্তের কথা শুনলাম কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা দেখলাম না। তাই তীর্যক বাক্যে অনেকে বলেন, এখন কি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার নীতিনির্ধারকদের সঙ্গেও এসব প্রকাশক আর কোচিং ব্যবসায়ীদের আঁঁতাত হয়ে গেছে? না হলে শিক্ষাবিদগণ যাঁরা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত ও নিবেদিত তাঁরা নোট-গাইড কোচিং-এ শিক্ষার ক্ষতি নিয়ে এত আহাজারি করছেন আর উল্টো সব বৈধ করে দিচ্ছেন কেন নীতিনির্ধারকরা? তাদের খুঁটির জোরটি কোথায়?

কী ভয়ঙ্করভাবে জিপিএ ৫-এর পেছনে ছোটাচ্ছি আমাদের সন্তানদের! এখন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্কুলগুলোকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা জিপিএ ৫-এর রিলে রেসে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। অমুক স্কুল ১০০ ভাগ পাশ করেছে, ৯০ ভাগ জিপিএ ৫ পেয়েছে। মানদণ্ডে উজ্জ্বল হয়ে যাচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মুখ। সুতরাং এসব প্রতিষ্ঠান আরো শক্তভাবে জিপিএ ৫-এর ছক তৈরি করে দিচ্ছে। ছাত্রছাত্রী কী শিখলো বড় কথা নয়, পরীক্ষা পর্যন্ত ঠিক ছকে হাঁটলো কিনা এটি হচ্ছে বিবেচনার। অভিভাবকের সংকট দুটো—একটি যাঁরা বিশ্বাস করেন পিইসি আর জেএসসি পরীক্ষায় ভালো না করলে পছন্দমত গ্রুপ নিতে পারবে না। পরবর্তী পরীক্ষায়ও পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকছে। দ্বিতীয়ত, তাদের সন্তান জিপিএ ৫ না পেলে সামাজিক-পারিবারিক সম্মান হারাতে হবে। তাই খেয়ে না খেয়ে সংগ্রহ করো নোট-গাইড আর ছুটতে থাকো একের পর এক প্রাইভেট টিউটর অথবা কোচিং সেন্টারের কাছে। শিক্ষাব্যবস্থার এই ভয়ঙ্কর ফাঁদে পরে শিশু শিক্ষার্থী জীবনের শুরুতেই হারিয়ে ফেললো সবুজ শৈশব। উন্মুক্ত আকাশের নিচে ছুটে বেড়াতে শিখলো না। প্রকৃতি আর পরিবেশের কাছ থেকে কিছু শেখার সু

শৈশব থেকে তরুণ বয়স পর্যন্ত এভাবে ছুটতে ছুটতে এসব দুর্ভাগা শিক্ষার্থী এসে হাজির হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। যাদের ভাগ্যের চাকা ঘোরে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এমন জিপিএ ৫ ও স্বর্ণখচিত ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের শতকরা চার-পাঁচজনও যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাশ নম্বর পায় না তখন হৈচৈ ওঠে। পত্রিকায় নানা কিছু লেখা হয়। টিভি টকশোতে নানা টক ঝাল কথা ওঠে। আর আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত আছি তাঁরা অভিজ্ঞতার আলোকে বলি— পাশের হার যদি এর চেয়ে বেশি হতো তবে আমরা বিস্মিত হতাম। কারণ যে ছকবন্দি পড়ায় পিইসি থেকে এইচএসসি পর্যন্ত পড়ে জিপিএ ৫ পাওয়া যায় সেই পড়ায় ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করা যায় না। পুরো বইয়ের সঙ্গে যে শিক্ষার্থীর সম্পর্ক না থাকে, জগত-জীবন সম্পর্কে ধারণা না থাকে তার পাশ করার তেমন কারণ নেই। অনেক ক্ষতি করে সম্প্রতি ফলাফলের মহোত্সব থেকে এখন একটু পিছু হটেছে সরকার।

আমার মধ্যে একটি প্রশ্ন কাজ করে তা হচ্ছে সত্তর-আশির দশকে আমরা অধিকাংশ স্কুলের তত্ত্বাবধানে ক্লাশ করে, বাড়িতে চর্চা করে পরীক্ষার বৈতরণী পার হতাম; আজ কেন নোট, গাইড আর কোচিং ছাড়া চলা যায় না? আমরা কি সমাজ ও শিক্ষা জীবনে অচল হয়ে পড়েছি? এখন না হয় শিক্ষা কারিকুলামে কিছু পরিবর্তন এসেছে। এর জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ হতে পারে বা প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে শিক্ষককে। জীবন ধারণের প্রশ্নে শিক্ষককে প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে। আর এসব না করে শিক্ষার্থীর জ্ঞানচর্চা আর মেধা বিকাশের জায়গাটিকে বিকলাঙ্গ করে দেয়ার জন্য নোট-গাইড আর কোচিংয়ের বিষবৃক্ষ রোপণের এত উত্সাহ কেন সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাবানদের তা বুঝতে পারি না। এমন দুর্ভাগ্য খুব বেশি দেশের শিক্ষার্থীর বোধ হয় নেই।

আর অভিভাবকদের মধ্যেও যেন এক অদ্ভুত বৈকল্য তৈরি হয়েছে। প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণির সন্তানকেও অনৈতিকতার হাতেখড়ি দিচ্ছেন নিজেরাই। টাকা খরচ করে কিনে আনছেন অবৈধ প্রশ্ন। সন্তানকে সুপথে চলার নৈতিক শিক্ষা না দিয়ে হাতেকলমে অনৈতিক হওয়ার পথ দেখাচ্ছেন।

নানা নামের নানা পরীক্ষার এমন নিরীক্ষা কটা দেশে হয়! এতসব পরীক্ষা আর নানা প্লাস-মাইনাস ফলাফলের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামিয়ে অনৈতিকতার নানা পথ তৈরি করছি আমরা। শিশু বয়স থেকে একজন শিক্ষার্থীকে মেধা বিকাশের পথ না দেখিয়ে, চিন্তার স্বাধীনতার দরোজা-জানালা খুলে না দিয়ে যখন পরীক্ষার শেকলে বেঁধে ফেলতে চাই তখন এর চেয়ে ভয়ের কিছু থাকতে পারে না।

ইউরোপের ঐতিহাসিক কলিংউড গত শতকে একটি মূল্যবান কথা বলেছেন, তা হচ্ছে ইতিহাস লিখবেন একমাত্র পেশাজীবী ইতিহাসবিদ। কারণ তিনিই জানেন কোন পদ্ধতিতে ইতিহাসের সূত্র সংগ্রহ করতে হয়, বিশ্লেষণ করে সত্যের কাছে পৌঁছা যায়। কলিংউডের সূত্র ধরেই বলা হয় ইতিহাসের ঘটনা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখেন রাজনীতিকগণ আর তা বিশ্লেষণ করে ইতিহাস রচনা করেন ইতিহাসবিদ। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য এদেশে ইতিহাসের ঘটনা সৃষ্টি করেন রাজনীতিবিদরা আবার তারাই ইতিহাস রচনা করেন।

বোধ করি গত বছরের ঘটনা। প্রায় অপ্রয়োজনীয় পিইসি ও জেএসসির ঝকঝকে ফলাফল নিয়ে যখন শহরের নামকরা স্কুলগুলোতে বাদ্য বাজিয়ে কৃতি শিক্ষার্থী, তাঁদের অভিভাবক আর শিক্ষকরা উল্লাস করছেন তখন পত্রিকার পাতা থেকে জানা গেল মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে জেএসসি পরীক্ষায় পাশ করতে না পেরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে আসমা আক্তার নামে এক ছাত্রী। অভাবের সংসারে অনেক কষ্টে পড়াশোনা চালাতে হয়েছিল তার ভ্যানগাড়ি চালক বাবাকে। জেএসসির চাপ না থাকলে মেয়েটি হয়তো এসএসসি পর্যন্ত নিজেকে প্রস্তুত করার সুযোগ পেত। একই পরীক্ষায় পাশ না করতে পেরে কুমিল্লার মুরাদনগরে অন্তরা দেবনাথ নামে এক ছাত্রী আত্মহত্যা করেছে।

এই দুই আত্মহত্যার দায় কে নেবে? আত্মহত্যা না করলেও এসব পরীক্ষার বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় হতাশ হয়ে অনেকে ছিটকে পড়ছে শিক্ষাজীবন থেকে। এইসব পরীক্ষা, কোচিং আর নোট-গাইডের উদগ্র প্রতিযোগিতা ক্রমে যেন জাতির গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ফাঁসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বহুমাত্রিক প্রশ্ন ফাঁসের যুপকাষ্ঠ। আর তাতে বলি দিচ্ছি শুধু আগামী প্রজন্মকেই নয়—নিজেদের বিবেককেও। আমরা মনে করি এই ক্রমে জমাট বাঁধতে থাকা অন্ধকার সরাতে হলে সরকারকেই প্রধান ভূমিকা নিতে হবে। সেই সঙ্গে নিতে হবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কোনো রকম অনুকম্পা বা বিশেষ ক্ষেত্রে প্রশ্রয়ের চিন্তা মাথায় রেখে সুন্দর ভোরের স্বপ্ন দেখা নিরর্থক।

লেখক :অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

shahnawaz7b@gmail.com

উৎস: ইত্তেফাক