নির্বাচনের চেয়ে নির্বাচনী ব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরী : ডা. রিয়াজুল ইসলাম রিয়াজ

 
 

11দেশের মধ্যে মধ্যবর্তী নির্বাচন হোক আর মেয়াদের শেষেই হোক, নির্বাচনের হাওয়া যেন বইতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেত পেয়ে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা দান দক্ষিণা সহ গরীব ধনীদের মিলিয়ে কেজি ১০ টাকা দরে চাল দিচ্ছে। জাতীয় পার্টির এরশাদ সাহেব তো ১ অক্টোবর সিলেট থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরুই করে দিয়েছেন। ইসলামী আন্দোলন এর আমির চরমোনাই’র পীর দেশের সবকটি আসনে প্রার্থী আগেই চুড়ান্ত করে রেখেছে। রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে হাত পাখা মার্কায় ভোট নেয়ার জন্য খুব কৌশলে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে সরকারের এমপি-মন্ত্রীরা সব সময় বলে আসছেন জাতীয় নির্বাচন হবে ২০১৯ সালে এবং তা হবে প্রধানমন্ত্রীর অধিনে। ২ অক্টোবর এইচটি ইমাম বলেছেন, দেশে উন্নয়নের জন্য আওয়ামীলীগকে আরও কয়েকবার ক্ষমতায় যেতে হবে। কেউ বলেছেন ৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা দরকার হবে। তাদের ভিষণ যেন কোন দিন শেষ হবে তা মনে হয় আওয়ামীলীগও জানেনা। ভারতের কংগ্রেস ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ৩০ বছর ক্ষমতায় ছিল। বন্ধুর মত বন্ধুতম একটি দেশ হলেই যথেষ্ট। মনে হয় এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েই আওয়ামীলীগ সামনে চলছে জোর কদমে। তবে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থা যদি পরিবর্তন করা না হয় তাহলে মধ্যবর্তী নির্বাচন আর আগাম নির্বাচন যাই বলেন না কেন ২০২৫ সালে নয় ২০৪০ সালে নির্বাচন দিলেই বা সমস্য কি? কারণ এ ব্যবস্থা অপরিবর্তিত রেখে নির্বাচন দিলে তো আওয়ামীলীগই ক্ষমতায় যাবে। যার প্রমাণ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। দেশের মধ্যে নির্বাচনের যে ধারা চলে আসছে তাতে বাংলাদেশে দুর্নীতি মুক্ত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আর কোন দিন হবে কি-না, তাতে আমার যথেষ্ট সন্দেহ। কারণ প্রধানমন্ত্রী সহ এমপি-মন্ত্রীরা স্বপদে থেকে এবং সংসদ কার্যকর রেখে নির্বাচন দিবে তাতে সরকারী দলের প্রার্থীদের নামেই বিজয় ঘোষণা করা হবে।

অনেকের ধারণা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী নির্বাচনে ৫ শতাংশ ভোট কাষ্ট হয়েছে। তবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ফেমা ১০ শতাংশ ভোটের কথা বলেছে কিন্তু সব উড়িয়ে দিয়ে নির্বাচন কমিশন দাবি করেছিল ৪০ শতাংশ ভোটের এ নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহ ভারত ছাড়া অনেক দেশই অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সংবিধান সমুন্নত রাখার চমক দেখিয়ে আওয়ামীলীগের সবাইকে ঠান্ডা করে দিয়ে আড়াই বছর পার করে নিলেন, বিএনপির সব আশা ভুন্ডুল হয়ে গেল। তবে তত্ত্বাবদায়ক সরকার ব্যবস্থা আর ফিরে আসবে না, তাও সত্য। দিন যত গড়াচ্ছে আওয়ামীলীগের ক্ষমতা দ্বিগুণ গতিতে বাড়ছে। তবে দেশের অভিজ্ঞজনরা বলেছেন যে, দেশের অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করে সরকার সার্চ কমিটি করলে এ সংক্রান্ত বিতর্কের অবসান হবেনা। পাশাপাশি দেশের সুশীল সমাজ বলেছেন যে, আগামী নির্বাচনগুলো অবাধ নিরপেক্ষ সুষ্ঠু প্রভাবমুক্ত করতে হলে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের বিকল্প নেই। আর তা সবার মতামতের ভিত্তিতেই নিতে হবে।

এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখওয়াত হোসেন বলেছেন, নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সংবিধানে একটি আইন তৈরীর কথা বলা হয়েছে। সবার সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি সরকার গঠন করতে পারে। এতে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যাবে এবং নির্বাচন কমিশনের উপরও আস্থা বাড়বে কিন্তু সরকারের সদিচ্ছা না থাকলে কখনই সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করা যায়না। নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং নির্বাচন কমিশন যদি পরিবর্তন করা না হয় তাহলে দেশের অবস্থা কি হবে। আমরা একটু পিছানে ফিরলে দেখতে পাই ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য দশম জাতীয় সংসদের ভাঙা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হিংসা আর হানাহানির অপরাজনীতি সমগ্র বাংলাদেশকে সন্ত্রাসের উপত্যকায় পরিণত করেছে। একের পর এক চলছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ডাকা হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি। প্রতিদিন রাজপথ-জনপথ ভাংচুর হচ্ছিল, গাড়িতে-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ হয়, আগুনে পুড়ে দগ্ধ হয়ে মরছিল, নয়তো বা দগ্ধ দেহের যন্ত্রণা নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে কাতরাচ্ছিল বহু নারী-পুরুষ। খুন-জখমের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছিল। এর আগে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনে এতে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর নজির নেই। পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী তখনকার দু’মাসে নিহতের সংখ্যা ১৩০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

বর্তমান রাজনৈতিক হানাহানি ও সন্ত্রাসের কারণ অনুসন্ধান করতে হলে যেতে হবে এর উৎপত্তি স্থলে। বলাই বাহুল্য, উৎপত্তি স্থলটা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী। এই সংশোধনীর মাধ্যমে একটি মীমাংসিত বিষয়কে তুমুল বিতর্কের মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়েছিল।

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওয়ামীলীগের দাবি আরও আগের। ১৯৯৩ সালের ২৮ অক্টোবরেই তারা জাতীয় সংসদে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে একটি মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য পেশ করেছিল। কিন্তু বিধিসম্মতভাবে পেশ না করায় তা উত্থাপিত হয়নি। সংসদ সচিবালয় থেকে বিধিসম্মতভাবে মূলতবি প্রস্তাবটি আবার পেশ করার জন্য বলা হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিএনপি তা নাকচ করে দেবে অজুহাত দেখিয়ে আওয়ামীলীগ তা করেনি। তৎকালীন বিএনপি সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানতে চাননি। তিনি ভারতসহ বিভিন্ন সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশের উদাহরণ দিয়েছিলেন, যেমন এখন দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিন এবং তার মন্ত্রী-মিনিস্টাররা। খালেদা জিয়া এমনও বলেছিলেন, “শিশু আর পাগল ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ হয়না।” শেখ হাসিনাও বলেছিলেন, “হয় কিনা ঝাঁকি মেরে বুঝিয়ে দেব।” হ্যাঁ, তিনি তা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা মানতে বাধ্য করেছিলেন খালেদা জিয়াকে। এজন্য ১৭৩ দিনের হরতাল-অবরোধ এবং ১৯৯৬ সালের ৯ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত অসহযোগ আন্দোলন করেছিলেন। সেই আন্দোলন শুধুই সহিংস ছিল না, ছিল ভয়ঙ্করভাবে সহিংস। ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গণকার্ফু জারি করেছিল আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট এবং তাদের যুগপৎ আন্দোলনের ঘনিষ্ঠ মিত্র জামায়াতে ইসলামী ও এরশাদের জাতীয় পার্টি। ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, হত্যা, সন্ত্রাসের ঘটনাও ঘটেছিল। সবই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে। তখনও সব ঘটনার দায় বিরোধী দলের ওপর চাপাতে চেয়েছিল বিএনপি সরকার। কিন্তু জনগণ তা বিশ^াস করেনি, আমলে নেয়নি। তারা বিশ^াস করেছে, সরকার বিরোধী দলের ন্যায্য দাবি না মানার কারণেই এসব হচ্ছে।

সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটির কার্যাবলি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কমিটির সব সদস্যই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রাখার পক্ষে ছিলেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। কমিটির ২৭টি সভার মধ্যে ১৪তম সভাতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রাখার বিষয়টি ফায়সালা হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদের ব্যাপারে একটি সুনির্দিষ্ট ‘টাইম ফ্রেম’ বেঁধে দেয়ার সংশোধনী দিয়েছিলেন। কমিটি যেসব বিশেষজ্ঞের মত নিয়েছিল তারাও সবাই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। এসব মতামতের ভিত্তিতে এ সংক্রান্তে সংশোধিনীর খসড় প্রস্তুত হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুমোদনের জন্য পেশ করার দিনই সব বদলে যায়। সিদ্ধান্ত হয়ে যায় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের। এ ব্যাপারে বারবার উচ্চ আদালতের রায়ের কথা বলা হয়, এখনও বলা হচ্ছে। কিন্তু এটা তো রায়ের ভগ্নাংশ। উচ্চ আদালত সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষে বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তী আরও দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা যেতে পারে বলে রায়ের অপরাংশে উল্লেখ করেছেন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দীন আহমেদ বলেছিলেন, প্রধান বিবদমান রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে সমঝোতার জন্য তারা অপেক্ষা করবেন। দশম নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণার ব্যাপারে কোনো তড়িঘড়ি করা হবে না। ২৪ নভেম্বর বিকালে এই কথা বলে ২৫ নভেম্বর কয়েক ঘন্টার ব্যবধানেই তিনি তার কথা ফিরিয়ে নেন। ওইদিনই তিনি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে দেন। বিএনপিকে সব কাজ সম্পাদন করে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার জন্য সময় দেন মাত্র ছয় দিন। দু’মাস আগে থেকেই শাসক দল নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং প্রধানমন্ত্রী তার দল ও জোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। তাদের প্রার্থিতা, আসন ভাগাভাগি সবই চুড়ান্ত ছিল। তাদের সব প্রস্তুতি সম্পন্নের পর হঠাৎ করেই সিইসি তফসিল ঘোষণা করেন। এর উদ্দেশ্যও বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা। অথচ তখনও জাতিসংঘসহ জাতীয়-আন্তর্জাতিক নানা মহল থেকে সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতা এবং সবার কাছে গ্রহনযোগ্য একটি নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ চলছিল।

পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, সরকার পরিকল্পিতভাবে বিরোধী দলকে সহিংস পথে নামার জন্য উস্কানি দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। তারা জানে প্রভোগেশন ভায়োলেশনকে অনিবার্য করে তোলে। সরকার এটা করছে বিরোধী দলকে অজনপ্রিয় করার উদ্দেশ্যে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, দেশে বর্তমান সহিংস ঘটনার সব দায় বিরোধী দলের ঘাড়ে চাপিয়ে ফায়দা নিতে চাচ্ছে সরকার ও সরকারি দল। কিন্তু তখনকার দু’মাসে নিহত প্রায় ১৩০ জনের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ তো মারা গেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সরকারি দলের লোকজনের হাতে বিরোধী দল তো তেমনই অভিযোগ করছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বর্তমান সঙ্কট ও সহিংসতা প্রধানত নির্বাচন কেন্দ্রিক। বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সহ বেশ কয়েকটি নির্বাচনপন্থী দল। লেভেল প্লেইং ফিল্ডে লড়তে দিলে নির্বাচনে শুধু আসতোই না, তখন তারা ঝাঁপিয়ে পড়তো। কিন্তু সরকারই তখন তা চায়নি। অতীতে আওয়ামীলীগ ও তার মিত্ররা যেমন নির্দলীয় সরকারের অধীনে লেভেল প্লেইং ফিল্ডে নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য রক্তক্ষয়ী, সহিংস আন্দোলন করেছে এখন বিএনপিও একই কারণে, একই উদ্দেশ্যে সহিংস আন্দোলনে নেমেছে। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে একটা সমঝোতায় পৌঁছানো গেলে একাদশ নয়, দশম সংসদ নির্বাচনের সঙ্কটও (সংসদ ভেঙে দিয়ে পরবর্তী নবক্ষই দিনের সাংববিধানিক সুযোগ কাজে লাগিয়ে) কেটে যেতে পারতো। কিন্তু এখনো যদি নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা ও নির্বাচনী ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন করা না হয়, তাহলে বিপদ কারোই পিছু ছাড়বে না এবং এবার বিপদ হতে পারে অতীতের চেয়েও বড় বিপদ। ক্ষমতার কাঙালদের লাগানো আগুনে এখন জ¦লছে দেশ, জ¦লছে মানুষ; তখন জ¦লবে শুধু ক্ষমতার কাঙালরা।  লেখকঃ- রাজনীতিবিদ ও কলামিষ্ট