ধর্ষণ মামলা : কাকে বিশ্বাস করবো?

 
 

Mashuda-bhatti1953

মাসুদা ভাট্টি :: দেশের রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকার একটি হোটেলে দু’জন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে তারা অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতাশালী। যথারীতি এই অভিযোগকে কী করে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা যায় অর্থাৎ যা কিছু হয়েছে সম্মতিতে হয়ছে, এতো রাতে হোটেলে মেয়েগুলি কী করছিলো, থানাওয়ালাদের মামলা নিতে গড়িমসি, গণমাধ্যমে নানা ধরনের অপপ্রচার এবং সর্বশেষ আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যর ভিডিও প্রকাশ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের মতো দেশে একটি “আদর্শ ধর্ষণ মামলা” যেরকম হওয়া উচিত ঠিক সেরকমভাবেই মামলাটি এগুচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যেই আরেকটি ইস্যু জাগ্রত হবে এবং বনানী ধর্ষণ ইস্যুটি চাপা পড়ে যাবে আরেকটি ইস্যুর তলায়। তারপর এর পরিণতি কী হবে তা নিয়ে আবার কোনো একদিন হয়তো লিখবো, কিন্তু আজকে এই ধর্ষণকে কেন্দ্র করে কিছু পুরোনো প্রশ্ন আবারও সামনে চলে এসেছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করতে চাই।

১. প্রচলিত ধারণা হলো ধর্ষণ সাক্ষ্য রেখে ঘটে না এবং ধর্ষণের শিকার মূলতঃ নারী। পুরুষের ক্ষেত্রে বিশেষ করে ছেলে শিশু বা বালকের ক্ষেত্রেও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, যদিও সমাজ একে পুরোপুরি চাপা দিয়ে রাখতে চায় বলে প্রতীয়মান হয়। কিন্তু আমরা ধর্ষণকে নারীর প্রতি পুরুষের দ্বারা সৃষ্ট সহিংসতাকেই এই আলোচনায় মুখ্য বিবেচনা করছি। আজকাল বলিউডের একটি ফিল্মের উদ্ধৃতি থেকে জানতে পারি যে, ‘না মানে না’ অর্থাৎ কোনো পুরুষ কোনো নারীকে যৌনভাবে কামনা করলে নারীটি যদি সামান্যতম নেতিবাচক ইঙ্গিতও করে তাহলেও ধরে নিতে হবে যে, নারীটি পুরুষটিকে চাইছে না। এই সামান্য ‘না’-র পরেও যদি কোনো পুরুষ নারীকে যৌন-ইচ্ছা নিয়ে ছোঁয় সেটিও ধর্ষণের শামিল। আমি জানি, এ পর্যন্ত পড়ে অনেকেই আশ্চর্য হচ্ছেন, আমি কি ধর্ষণের সংজ্ঞা দিতে বসেছি নাকি? মোটেও না, আইনের ভাষায় ধর্ষণ পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই প্রায় এক রকম, কিছু কিছু ব্যতিক্রম থাকতে পারে কিন্তু সেটা ধর্তব্য নয়। তার মানে এটাও সত্য যে, এই ‘না মানে না’ পৃথিবীর সর্বত্রই স্বীকৃত সত্য, তারপরও কিন্তু বলিউডের সিনেমা সেকথা আমাদের আবারও শেখায় কারণ, আমরা বিষয়টি ইচ্ছে করেই ভুলে যাই। একেকটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে আর আমরা এ বিষয়ে নতুন করে চর্চা শুরু করি। এই চর্চা নানাবিধ, আজকাল সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে এই চর্চা আবার নতুন মাত্রাও লাভ করেছে বটে।

২. বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে ধর্ষণের বেশিরভাগ (প্রায় সত্তর শতাংশ) ঘটনা নথিভুক্ত (রিপোর্ট) হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীকে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরে নিজেকে সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্র থেকে বাঁচানোর জন্য একরকম পালিয়ে থাকতে হয়। পালিয়ে থাকার কারণ ধর্ষণের শিকার নারীটি পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র কারো কাছ থেকেই কাঙ্খিত সহযোগিতা পায় না, ফলে নারীটি হয় আত্মহত্যা করে না হয় জীবনের বাকি দিনগুলি এই ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা নিয়ে জীবন্মৃত হয়ে জীবন যাপন করে। কিন্তু যে নারীটি বা তার পরিবার একটু সাহসী হয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারস্থ হয় তখন প্রথমে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে মেয়েটিকে ও তার পরিবারকে সবিস্তারে ধর্ষণের বর্ণনা দিতে হয়। সম্পূরক প্রশ্নে নারীকে এই উত্তর দিতেই হয় যে, ঘটনার সময় আপনি ওখানে কী করছিলেন? যদিও এ প্রশ্ন কিন্তু ধর্ষণকারীকে করা হয় না, যেনো পুরুষ যে কোনো জায়গায় যে কোনো সময় যেতে পারে কিন্তু একটি নারী যে কোনো সময় যে কোনো জায়গায় যেতে পারে না, যাওয়া উচিত নয়, পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র নারীকে একটি লক্ষণ রেখা টেনে দিয়েছে, এর বাইরে নারী যাওয়া মানেই ধর্ষণের শিকার হওয়া, এতে পুরুষের কোনো দায় নেই, কারণ পুরুষ ধর্ষণ করতেই পারে।

এটি আমি স্বাভাবিক অবস্থার কথা বলছি। থানায় শুরু হওয়া প্রশ্নাবলী শেষ করে নারীটি যখন পরিবারে ফিরে আসে, সমাজের সামনে বের হয় তখন নারীটির দিকে হাজারো চোখ প্রশ্ন নিয়ে তাকায়। কী হয়েছিল সেই সময়? এটি সাধারণ প্রশ্ন কিন্তু এই প্রশ্নের যে কতো ভয়ঙ্কর রূপ হতে পারে সেটি কেবল ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীটিই বুঝতে পারে বা জানে। আর যদি একজন গণমাধ্যমকর্মীর কাছে নারীটি যায় সাহায্য নিতে তাহলে তাকে আবারও সেইসব প্রশ্নাবলীর ভেতর দিয়ে যেতে হয়। যে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার অর্থই হচ্ছে বার বার ধর্ষণের শিকার হওয়া। এইসব প্রশ্নের দেয়াল টপকে নারী আদালত পর্যন্ত গেলেও আদালতে শুরু হয় নতুন নাটক। আদালতে ঘটা দৃশ্যাবলী, প্রশ্নাদিও আমরা হিন্দি ফিল্মের কল্যাণে জানি। নব্বইয়ের দশকে দামিনী নামে একটি সিনেমায় আমরা দেখেছিলাম যে, আদালতে কী করে ধর্ষকের পক্ষের উকিল কী ভাবে নারীকে ভরা আদালতে বার বার ‘ধর্ষণের মুখোমুখি’ করে তোলে। যারা এই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে কখনও যাননি তারা আসলেই বুঝতে পারবেন না একটি ধর্ষণ মামলার শুনানী চলাকালে কতোজন গোপন কামনার খোরাক জোগানোর জন্য আদালতে হাজির থাকে।

৩. এতোকিছুর পরও আদালতে ধর্ষণ মামলার বিচার শেষে ধর্ষককে যদি আশানুরূপ শাস্তি নিশ্চিত করা না যায় তাহলে ধর্ষণের শিকার একজন নারী কেন এতোগুলো দেয়াল পার হবে বলতে পারেন? আমি জানি আমার পক্ষে এরকমটি বলা খুউব সোজা কারণ আমাকে কখনও এই ভয়ঙ্কর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক নিগ্রহের ভেতর দিয়ে যেতে হয়নি। যদি যেতে হতো তাহলে হয়তো আমিও বলতাম যে, যত বাঁধাই আসুক না কেন ধর্ষণকারীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেতেই হবে। কিন্তু আমি বা আমার মতো অনেকেই আমরা কেবল প্রশ্ন তুলে যাই, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অগ্নিঝরা স্ট্যাটাস দেই, টকশো করি, কলাম লিখি- আমাদের ক্ষমতা এতোটুকুই হয়তো। কিন্তু তাতেও যে কিছু কাজ হয় তা অবশ্য বনানী-কাণ্ডে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এতোটা সোচ্চার না হলে হয়তো অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতা দিয়ে এই ঘটনাটিও ছাইচাপা পড়ে যেতো, কিন্তু সেটা হতে পারেনি বলেই অন্ততঃ দু’জন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। যাদের থাকার কথা ছিল জামাই আদরে তারাই এখন রিমান্ডে আছে, এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়ার কারণেই। যদিও এখনও অনেকেই সন্দেহ করেন যে, আদালতে যেমন অভিযুক্তদের একজনের ‘বাপ’ বলেছে, “চিন্তা নেই, কিছুই হবে না”, আসলেই কি শেষ পর্যন্ত কিছুই হবে না? দেশের গণমাধ্যমে যে মানুষ বড়াই করে বলে যে, “এই বয়সে এরকম এক-আধটু অপরাধ করতেই পারে” এবং যার অর্থবলের মাপকাঠি আমাদের কারোরই জানা নেই, সেক্ষেত্রে এই মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয় বটে।

৪. কিন্তু এই মামলাই বড় কথা নয়, দেশে ২০১৫-১৬ বছরে সাড়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি ধর্ষণের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে যাদের মধ্যে সাতশ’রও বেশি নারীকে ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয়েছে। এগুলোর বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশন টকশো’তে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী একথাও বলেছেন যে, ধর্ষণ মামলা প্রমাণ করার ক্ষেত্রে বহুবিধ প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এবং সেগুলো শেষে ধর্ষককে শাস্তি দেওয়া সহজ কাজ নয়। তার মানে হচ্ছে, আইনের এই প্রক্রিয়া যেমন নারী-বান্ধব নয় অর্থাৎ এই প্রক্রিয়ায় ধর্ষণের শিকার নারী যেমন ধর্ষণ প্রমাণে অসম্ভব কষ্টের ভেতর দিয়ে যায় তেমনই সমাজও তার বান্ধব নয়, যেকথা আগেই বলেছি। তাহলে নারী আসলে কার কাছে যাবে? ধর্ষণের শিকার হয়েও নীরবে অশ্রু বর্ষণ করে চলাফেরা করা লাশ হয়ে বেঁচে থাকবে?

৫. একটি টকশোয় আবেদন জানিয়েছিলাম ধর্ষণের অভিযোগ আসার পর থেকে একেবারে বিচার প্রক্রিয়ায় শেষাবধি যদি নারী দ্বারা সবকিছু পরিচালিত হয় তাহলে কি ওপরে বলা সমস্যা থেকে একটু হলেও মুক্ত হওয়া যাবে? রাষ্ট্র যতোদিন না পুরুষকে তথা গোটা সিস্টেমকে ‘নারী-বান্ধব’ করতে সক্ষম হচ্ছে, অন্ততঃ ততোদিন নারী-প্রাধাণ্যে ধর্ষণের অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়, তাতে কিছু কি বদল আসতে পারে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই প্রশ্ন তোলার পর অনেকেই একমত হয়েছেন। কিন্তু যারা দ্বি-মত পোষণ করেছেন তাদের যুক্তিও ফেলনা নয়। তারা বলতে চাইছেন যে, ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীকে আরেকজন নারীও পুরুষতান্ত্রিক বা সমাজের প্রচলিত নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে দেখে না। ফলে নারীদের দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ থেকে বিচার পর্যন্ত চলা কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে কোনো লাভ হবে না। একজনতো বলেইছেন যে, রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী যেখানে নারী সেখানেওতো নারীকে এই নিগ্রহ থেকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু আমরা একথা ভুলে যাই যে, একটি সর্বোতভাবে পুরুষতান্ত্রিক দেশে একজনমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী বা কয়েকজন মন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধী দলীয় নেতা বা ডিসি-সচিব খুব কার্যকর ভাবে নারীর জন্য আলাদা করে কিছু করতে পারে না। যদিও এ প্রশ্ন তোলা জরুরি যে, পরিবর্তন কি কিছুই হয়নি নারীর এই ক্ষমতায়নে? সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীর জায়গা হওয়ায়?

ভারতবর্ষের মধ্যে বাংলাদেশ নারীর ক্ষমতায়নে এগিয়ে থাকায় যে উপকার হয়েছে তা হয়তো আমরা এখন বুঝতে পারবো না, কিন্তু সেটা অচিরেই বোঝা যাবে। আমি এই বোঝার জায়গাটি থেকেই বলতে চেয়েছি যে, হয়তো সম্পূর্ণভাবে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বা আচার-আচরণ থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বা ক্ষমতার প্রয়োগকারী নারীটি মুক্ত হতে পারবে না কিন্তু অন্ততঃ এটাতো নিশ্চিত করা যাবে যে, একজন নারীর সামনে অভিযোগ জানাতে এসে ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীটি একটু ‘সহজ’ হয়ে দাঁড়াতে পারবে? সমাজের সেই নারীটি যে আসলে বাক্যোচ্চারণেও দ্বিধা করে কারো সামনে, একজন নারীর সামনে তার অভিযোগ করাটা কি সহজতর হতো না? জানি এর নানাবিধ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আছে, থাকবেই। আর সে কারণেই আজকে এ লেখার শিরোনাম দিয়েছি “কাকে বিশ্বাস করবো?”, হ্যাঁ, আমি ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীর হয়েই এই প্রশ্নটি সকলের সামনে রাখছি। আশাকরি, সকলে একবার হলেও প্রশ্নটি নিয়ে ভাববেন।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

উৎস : জাগোনিউজ।