ইংরেজি সনের তত্ত্বকথা ॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

 
 

caরোমক সম্রাট জুলিয়াস সিজারের আমলে আধুনিক বর্ষ গণনা নিরুপিত হয় এবং গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা ও গণনার মাধ্যমে একটি বৎসরের মাসিক বিভাজন নির্ণীত হয় এবং প্রতিটি চতুর্থ বর্ষকে ৩৬৬ দিন গণনা নির্ধারণ করা হয়। গণনাটি সে সময় যেরূপ নির্ধারণ করা হয়েছিলো মাসগত পর্যায়ক্রমে আজো তা অব্যাহত আছে। জুলিয়াস সিজারের ক্যালেন্ডারকে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার বলা হয়। সম্রাট অগাস্টাস আমলে এই কালেন্ডার কিছুটা সংশোধিত হয়।

বর্তমানে আমরা যে ক্যালেন্ডার ব্যবহার করি তা হচ্ছে প্লেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। ত্রয়োদশ প্লেগরি বিশ্ব ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের পোপ ছিলেন। তিনি ১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের সংশোধন করেন। সৌর জগতের গতিবিধিকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করে সূর্য পরিক্রমার সময়কাল যথাযথভাবে নির্ণয় করতে গিয়ে দেখা গেলো জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের গণনায় প্রতিটি বার্ষিক পরিক্রমায় এগারো মিনিট দশ সেকেন্ড বেশি হয়। পোপ গ্রেগরি কর্তৃক নিযুক্ত জ্যোতির্বিদগণ সামগ্রিক গণনা দশ দিন বাদ দেন, যাতে গণনাটি যথার্থ ও সঠিক হতে পারে। ১৭৫১ সালে গ্রেট ব্রিটেন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারটি গ্রহণ করে। তখন আবারো ক্যালেন্ডারটি সংশোধিত হয়। মূল গণনা থেকে এগারো দিন বাদ দিয়ে ক্যালেন্ডারটি আজ পৃথিবীর সর্বত্র প্রচলিত হয়েছে। পৃথিবীতে মোট তিন ধরনের ক্যালেন্ডার রয়েছে; চান্দ্র ক্যাল্ডোর, সৌর ক্যালেন্ডার এবং চন্দ্র-সূর্য মিলিত ক্যালেন্ডার।

ইংরেজী বর্ষরীতি পৃথিবীর সর্বত্রই স্বীকৃত। অন্যান্য ক্যালেন্ডার যারা ব্যবহার করেন তাঁরাও ইংরেজি বর্ষপঞ্জিকে অস্বীকার করতে পারেননি। প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নিজস্ব বর্ষপঞ্জি রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আদান-প্রদানের জন্য ইংরেজী ক্যালেন্ডারকেই অনুসরণ করতে হয়। আমরাও আমাদের কাজ-কর্মের সব জায়গায় ইংরেজি ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে থাকি।

পাশ্চাত্য এখন বিভিন্ন ক্ষেত্রে উৎকর্ষের শিখরে। পৃথিবীর সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের বিভিন্ন দিক এবং উন্নয়নের ক্রমধারা পাশ্চাত্য প্রভাবে পরিচালিত হয়। এই প্রভাবকে এড়িয়ে চলা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং ইংরেজি নববর্ষ বা পাশ্চাত্যের নববর্ষ মেনে নিয়েই আমাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রসর হতে হয়। আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেন, আমদানি-রপ্তানি, মতবিনিময়, আসা-যাওয়া, ভ্রমণ সবকিছু ইংরেজি ক্যালেন্ডারের গণনা অনুযায়ীই করতে হয়। রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসন পরিচালিত হয় ইংরেজি ক্যালেন্ডারের ভিত্তিতেই। আমাদের দেশে জাতীয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, ভাষা দিবস, মহান মে দিবস এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক দিবস ইংরেজি তারিখ অনুসারেই পালিত হয়। প্রায় দেশেই নিজস্ব বর্ষগণনা রয়েছে। চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ইত্যাদি দূরপ্রাচ্যে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত বর্ষগণনা চালু রয়েছে। আমরা আমাদের পালা-পার্বণ উৎসবে এবং বিয়ে-শাদীতে বাংলা সন এবং ধর্মীয় ক্ষেত্রে হিজরি সন অনুসরণ করে থাকি। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ-পরিচালন এবং অর্থনৈতিক কর্মাকান্ড সচল রাখার জন্য পাশ্চাত্যের ইংরেজি বর্ষগণনা মেনে নিয়েছি।

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের আগে ছিল জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের প্রচলন। জুলিয়ান ক্যালেন্ডারেরও আগে রোমানরা গ্রিক পঞ্জিকা অনুযায়ী বছর ধরত ৩০৪ দিনে। যাকে ১০ মাসে ভাগ করা হয়েছিল। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির জন্ম তখনও হয়নি। মার্চ ছিল বছরের প্রথম মাস। এক সময় রাজা পম্পিলিয়াস দেখলেন ৩০৪ দি হিসাবে বছর করলে প্রকৃতির সঙ্গে মিলছে না। খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০ সালে তিনি বছরের সাথে যোগ করলেন আরও ৬০ দিন। বছরের দিন বৃদ্ধি পেলো ঠিকই সঙ্গে সমস্যাও বৃদ্ধি পেলো ঋতুর চেয়ে সময় এগিয়ে আছে তিন মাস। তখনই জুলিয়াস সিজার ঢেলে সাজালেন বছরকে। নতুন দু’টি বছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে এলেন বছরের প্রথম দিকে। নিম্নে মাস ও সপ্তাহ নামের উৎপত্তির আলোচনা করা হলো-

ঔধহঁধৎু (জানুয়ারি): রোমে ‘জানুস’ নামক এক দেবতা ছিল। রোমবাসী তাকে সূচনার দেবতা বলে মানত। যে কোন কিছু করার আগে তারা এ দেবতার নাম স্মরণ করত। তাই বছরের প্রথম নামটিও তার নামে রাখা হয়েছে।
ঋবনৎঁধৎু (ফেব্রুয়ারি): রোমান দেবতা ‘ফেব্রুস’-এর নাম অনুসারে ফেব্রুয়ারি মাসের নামকরণ করা হয়েছে।
গধৎপয (মার্চ): রোমান যুদ্ধ-দেবতা ‘মরিস’ এর নামানুসারে তারা মার্চ মাসের নামকরণ করেন।
অঢ়ৎরষ (এপ্রিল): বসন্তের দ্বার খুলে দেয়াই এপ্রিলের কাজ। তাই কেউ কেউ ধারণা করেন ল্যাটিন শব্দ ‘এপিরিবি’ (যার অর্থ খুলে দেয়া) হতে এপ্রিল এসেছে।
গধু (মে): রোমানদের আলোকে দেবী ‘মেইয়ার’-এর নামানুসারে মাসটির নাম রাখা হয় মে।
ঔঁহব (জুন): রোমানদের নারী, চাঁদ ও শিকারের দেবী ছিলেন ‘জুনো’। তার নামেই জুনের সৃষ্টি।
ঔঁষু (জুলাই): জুলিয়াস সিজারের নামানুসারে জুলাই মাসের নামকরণ। মজার ব্যাপার হচ্ছে- বছরের প্রথমে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিকে স্থান দিয়ে তিনি নিজেই নিজেদে দূরে সরিয়ে দেন।
অঁমঁংঃ (আগস্ট): জুলিয়াস সিজার বছরকে ঢেলে সাজানোর পর আগস্ট মাসটি তার নিজের নামে রাখার জন্য সিনেটকে নির্দেশ দেন। সেই থেকে শুরু হয় আগস্ট মাসের পথচলা।
ঝবঢ়ঃবসনবৎ (সেপ্টেম্বর): সেপ্টেম্বর শব্দের শাব্দিক অর্থ সপ্তম মাস। কিন্তু সিজার বর্ষ পরিবর্তনের পর তা এসে দাঁড়ায় নবম মাসে। তারপর এটা কেউ পরিবর্তন করেনি।
ঙপঃড়নবৎ (অক্টোবর): ‘অক্টোবরের’ শাব্দিক অর্থ বছরের অষ্টম মাস। সেই অষ্টম মাস আমাদের ক্যালেন্ডারের এখন স্থান পেয়েছে দশম মাসে।
ঘড়াবসনবৎ (নভেম্বর): ‘নভেম’ শব্দের অর্থ নয়। সেই অর্থানুযায়ী তখন নভেম্বর ছিল নবম মাস। জুলিয়াস সিজারের কারণে আজ নভেম্বরের স্থান এগারতে।
উবপবসনব (ডিসেম্বর): ল্যাটিন শব্দ ‘ডিসেম’ অর্থ দশম। সিজারের বর্ষ পরিবর্তনের আগে অর্থানুযায়ী এটি ছিল দশম মাস। কিন্তু আজ আমাদের কাছে এ মাসের অবস্থান ক্যালেন্ডারের শেষ প্রান্তে।
প্রত্যেকটি দিনের নামের অর্থ ভিন্ন রকম। আমাদের সকলের নখদর্পণে সাতদিনের নাম। কিন্তু এই সাতদিনের নামের উৎপত্তিস্থল কোথায়, কিভাবে হলো তা আমাদের সকলের অজানা বা আমরা এই সম্পর্কে অবগত নই। তাহলে চলুন, আমরা নামগুলোর ইতিহাস থেকে ঘুরে আসি।
শনিবার: ইংরেজিতে বলা হয় ঝধঃঁৎফধু: রোমান সাম্রাজ্যের আমলের লোকেরা এই বলে বিশ্বাস করত যে, চাষাবাদের জন্য ‘স্যাটান; নামের একজন দেবতা আছেন। যার হাতে আবহাওয়া ভালো খারাপ করা লেখাটি আছে। তাই তাকে সম্মান করার জন্যই তার নামে একটি গ্রহের সাথে সপ্তাহের একটি দিনের নাম স্যাটনি ডেইজ রাখা হয়েছে। যার অর্থ হচ্ছে স্যাটানের দিন। বর্তমানে তা ‘স্যাটারডে’ নামেই পরিচিত।
রবিবার: ইংরেজিতে বলা হয় ঝঁহফধু: দক্ষিণ ইউরোপের সাধারণ ‘লোকেরা বিশ্বাস করত এবং ভাবত যে একজন দেবতা রয়েছেন যিনি শুধুমাত্র আকাশে গোলাকার আলোর বল অংকন করেন। ল্যাটিন ভাষায় যাকে বলা হয় ‘সলিছ’। এর থেকেই সলিছ ডে অর্থাৎ সূর্যের দিন। উত্তর ইউরোপের লোকেরা এই দেবতাকে ডাকত ‘স্যানেল ডেইজ’ নামে। যা পরবর্তীতে বর্তমান সান ডে-তে রূপান্তরিত হয়।
সোমবার: ইংরেজিতে বলা হয় গড়হফধু: এই নামের সাথেও দক্ষিণ ইউরোপের লোকেরা জড়িত। রাতের বেলায় আকাশের গায়ে রূপালী বল দেখে তারা ডাকত ‘লুনা’ নামে। ল্যাটিন শব্দ লুনা ডেইস। উত্তর ইউরোপের লোকেরা ডাকত মোনান ডেইজ। এ মানডে কিন্তু মোনান ডেজ থেকে রূপান্তর হয়।
মঙ্গলবার: ইংরেজি রূপ ঞঁবংফধু: আগেকার রোমান রাজ্যের লোকেরা বিশ্বাস করত যে, টিউ নামক একজন দেবতা আছেন যিনি যুদ্ধ দেখাশুনা করেন। তারা ভাবত যারা টিউকে আশা করত টিউ তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করত যুদ্ধের ময়দানে এবং যারা পরলোক গমন করেছে তাদেরকে টিউ পাহাড় থেকে নেমে একদল মহিলা কর্মী নিয়ে বিশ্রামের জায়গা ঠিক করত। তারা একে ডাকত ‘ডুইস’ নামে। যার ইংরেজি অর্থ টুইস ডে।
বুধবার: ইংরেজি রূপ ডবফহবংফধু: দেবতাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ‘উডেন’ বলে দক্ষিণ ইউরোপের লোকেরা ভাবত। তিনি সারা দিন ঘুরে জ্ঞান লাভ করতেন যার জন্য তার একটি চোখ হারাতে হয়েছিল। এই হারানো চোখকে তিনি সবসময় লম্বাটুপি দিয়ে আবৃত করে রাখতেন। দু’টো পাখি উডেনের গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করত, তারা উডেনের কাঁধে বসে থাকত। রাতে তারা সারা পৃথিবীর ঘটনাবলি উডেনকে শুনাত। এভাবেই উডেন সারা পৃথিবীর খবর শুনতে সক্ষম হন। এজন্য লোকেরা নাম রাখল ওয়েডনেস ডেইস। যা বর্তমান ওয়েডনেস ডে নামে পরিচিত।
বৃহস্পতিবার ইংরেজি রূপ ঞযঁৎংফধু: বজ্রপাত ও বিদ্যুৎ চমকানোর সম্পর্ক না জানার ফলে মানুষ মনে করত যে, বজ্রপাত ও বিদ্যুৎ চমকানোর জন্য একজন দেবতা দায়ী। তারা শুধু আলো জ্বলতে ও বিদ্যুৎ চমকাতে দেখত। তারা দেবতার নাম রাখে থর। তাদের মধ্যে এই অন্ধ বিশ্বাস ছিল যে, দেবতা থর যখন রাগান্বিত হন তখন তিনি রাগে আকাশে একটা হাতুড়ি নিক্ষেপ করেন দুটি ছাগলের গাড়িতে বসে। ছাগলের গাড়ি চাকার শব্দ হচ্ছে বজ্রপাত ও হাতুড়ির আঘাত হচ্ছে বিদ্যুৎ চমকানো। থরের প্রতি সম্মান রক্ষার্থে তারা সপ্তাহের একটি দিনের নাম রাখেন থার্স ডেইস। যাকে আজ আমরা থার্স ডে বা বৃহস্পতিবার বলে ডাকি।
শুক্রবার: ইংরেজিতে বলা হয় ঋৎরফধু: ওডিন একজন শক্তিশালী দেবতা। তার স্ত্রী দেবী ফ্রিগ ছিলেন ভদ্র এবং সুন্দরী। ওডিনের পাশে সব সময় তার স্ত্রী থাকতেন। পৃথিবীকে দেখতেন, প্রকৃতিকে উপভোগ করতেন, প্রকৃতির দেবী ভালোবাসা ও বিবাহের দেবীও ছিলেন ফ্রিগ। এই জন্য লোকেরা বাকি একটি দিনের নাম ‘ফ্রিগ ডেইজ’ বা ফ্রাইডে রাখেন।
লেখকঃ শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিষ্ট।