আজ ৫ম রমজান : ইফতার ও সাহরিতে রয়েছে অনেক সওয়াব

 
 

*মাওলানা মাহমুদুল হাসান*

Ramzan 5আজ ৫ম রমজান ১৪৩৮ হিজরি। রহমতের প্রথম দশকের অর্ধেক সময়কাল শেষ হয়ে যাবে আজ সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই। সংযম সাধনার মাহে রমজানের প্রতিটি দিনের সূচনা হয় সাহরির মাধ্যমে, আর সমাপ্তি হয় ইফতারের মাধ্যমে। রমজানের রোজার জন্য এ দুটি খাদ্য উপলক্ষ্য ও অনুষ্ঠান হচ্ছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রান্তসীমা। এ জন্য রমজানের রোজা তারাবির পাশাপাশি আরো যে ক’টি উপলক্ষ্য ও ইবাদত ব্যাপকভাবে সমাজকে স্পর্শ করে যায়, সে সবের মধ্যে দুটি হচ্ছে সাহরি ও ইফতার। বাহ্যত ইফতার ও সাহরি খাদ্য খাওয়ার দুটি সময়ভিত্তিক উপলক্ষ্য হলেও এর মাঝে বহু ফজিলত ও তাৎপর্য রয়েছে।

মাহে রমজানের রোজার পূর্ণ মাহাত্ম্য শুধু সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খানাপিনা থেকে প্রস্তুতবিহীনভাবে বিরত ও সংযত থাকলেই অর্জিত হয় না। সাহরি খাওয়া সম্পর্কে হজরত নবীয়ে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তাসাহহারু ফা ইন্না ফি সুহুরি বারাকাত।’ অর্থাৎ-তোমরা সাহরি খাও, কেননা সাহরি খাওয়ার মাঝে রয়েছে বরকত। স্মরণ রাখতে হবে, মানুষ খাওয়ার জন্য বাঁচে না বাঁচার জন্য খায়।

মনীষীরা সাহরির বিভিন্ন উপকারিতার বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, সাহরির বরকত ইহকাল ও পরকাল উভয়কালেই পাওয়া যায়। সাহরি খাওয়ার মাধ্যমে নবীর (সা.) সুন্নাত প্রতিষ্ঠিত হয়। রোজা রাখার শক্তি অর্জিত হয়, শেষ রাতে জাগ্রত হয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপযোগী ইবাদত আমলে নিমগ্ন হওয়া যায়।

অপরদিকে ইফতারের মাঝেও রয়েছে ফজিলত ও তাৎপর্যের আধার। হজরত রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁরা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষ দ্রুততার সীমা রক্ষা করে ইফতার করবে। অপর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হুজুর (সা.) বলেন, আমার উম্মত ততদিন পর্যন্ত অবশ্যই সুন্নতের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, যতদিন পর্যন্ত তাঁরা ইফতার করার জন্য নক্ষত্র উদয়ের অপেক্ষা না করবে। মূলত পূর্ব যুগে ইয়াহুদি খ্রিষ্টানরা রোজা রাখার পর ইফতার করতে ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করত। এতে ইফতারের ফজিলত ও মাহাত্ম্য থেকে তাঁরা বঞ্চিত হতো। এ বঞ্চনা যেন এ উম্মতেরও ভাগ্যে না হয়ে যায়, তিনি সেদিকেই উম্মতের প্রতিটি সদস্যের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। কেবল নিজে না খেয়ে অপর যে-কোনো রোজাদারকে ইফতার করানোর জন্য বহু সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।

ইফতারের পূর্বমুহূর্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। দোয়া কবুল হওয়ার অন্যতম সময়। যথাসময়ে ইফতার করার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সংযম শেষে আল্লাহ তায়ালার দেয়া রিজিকের পুরস্কার আস্বাদনের একটি বান্দাসুলভ ব্যাকুলতার চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে বান্দার এই ব্যাকুল, কাতর ও আত্মসমর্পণমূলক চিত্র অত্যন্ত পছন্দনীয়। ইসলাম একটি নির্দিষ্ট সময় (সুবহে সাদিক) থেকে আরেকটি নির্দিষ্ট সময় (সূর্যাস্ত) পর্যন্ত কঠোর ও নিñিদ্র সংযমের একটি ভারসাম্যময় বিধান দিয়েছে। কেউ যদি সংযমের এ সময়কালটিকে নিজের থেকেই আরো দীর্ঘ করে তোলে, শেষ সময়ে সাহরি না খেয়েই রোজা রাখে এবং যথাসময়ে ইফতার না করে আরো বেশি কিছু সময়ক্ষেপণ করে, তাহলে তো সংযমের মাহাত্ম্য আরো বাড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এমন করা হলে তাতে শরিয়ত প্রদত্ত সীমা ও নীতিকে আত্মচিন্তার চাকুর নিচে বিসর্জন দেয়ার মতো ঘটনা ঘটে। এতে ইসলামের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়।

যুগস্রষ্টা আলেম হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভি (রহ.) বলেছেন, প্রত্যেক কাজের সীমা থাকা প্রয়োজন। অন্যথায় ভারসাম্যতা বজায় থাকে না। যদি রাসুলে করিম (সা.) রোজার সীমারেখা নির্ধারণ না করতেন তাহলে বিভিন্ন অসুবিধার সৃষ্টি হতো। তাই তিনি সাহরি ও ইফতারের সময় নির্ধারণের মাধ্যমে এই উদ্দেশ্য সফল করেছেন।

নামাজের পর দু’আ ইফতার ও শেষরাতে দু’আ বিশেষ করে দৈনন্দিন জীবনে মাসনুন দোয়াগুলোর প্রতি যতœবান হওয়া প্রয়োজন। তাছাড়া আরবি দুআগুলোর অর্থ ও মর্ম উপলব্ধি করে মুনাজাতে হাত তুললে তা মন ও হৃদয়কে নাড়া দেয়। কায়োমনোবাক্যে দোয়া করলে কবুল হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে বেশি। এ জন্য আরবি পঠিত দোয়া গুলোর মর্মার্থ জানার চেষ্টা করাও উচিত।

আসুন ইফতার সামনে নিয়ে নিজের বৈধ প্রয়োজন পরিবারবর্গ আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী, সমাজ, রাষ্ট্র ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনায় দোয়া করার অভ্যাস গড়ে তুলি।