আজ ৪র্থ রমজান : তারাবিহ আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের শ্রেষ্ঠতম একটি স্তর

 
 

*মাওলানা মাহমুদুল হাসান*

Mahe Ramzanআজ ৪র্থ রমজান ১৪৩৮ হিজরি। রমজান মাস সম্পর্কে আল¬াহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, শাহরু রমজানাল¬াজি উনজিলা ফিহিল কুরআন। রমজান এমন মাস যাতে পবিত্র কুরআন নাজিল হযেছে। (সূরা বাকারাহ) পবিত্র হাদিসে এ মাসকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে-আওয়্যাল বা প্রথম দশক রহমতের ২য় দশক মাগফিরাতের এবং ৩য় দশক দোজখ থেকে মুক্তির।

রমজান মাসের মৌলিক দু’টি ইবাদতের মধ্যে তারাবির স্থান দ্বিতীয়। পবিত্র রমজান মাসের রাতে এশার ফরজ ও সুন্নাত নামাজ আদায়ের পর বিতরের আগে বিশ রাকাত তারাবির নামাজ পড়া সুন্নাতে মুয়াক্কায়দাহ। পুরো রমজান মাসে তারাবির নামাজ জামাতে পড়া ও সম্পূর্ণ কুরআন একবার খতম করা ও সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। খতমে তারাবিতে হাফেজ সাহেবদের জন্য কোনো প্রকার টাকাপয়সার শর্তারোপ করা জায়েজ নয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজান মাসে ঈমান ও এহতেসাবের সঙ্গে শুধু সওয়াবের আশায় তারাবিহ পড়ে, তাঁর অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।

তারাবিহ সম্পর্কে মনীষী ডাক্তার আব্দুল হাই (রহ.) বেশ মজাদার ও চমৎকার তত্ত্ব তুলে ধরতেন। তিনি বলতেন, তারাবিহ খোদায়ি নৈকট্য অর্জনের এমন এক ইবাদত যার কোনো তুলনা হয় না। এই ইবাদতের মাধ্যমে মানুষ সাধারণ অন্যদিনের তুলনায় আল¬াহ তায়ালার নৈকট্য অর্জনের শ্রেষ্ঠতম একটি স্তর। কেননা তারাবির নামাজ ২০ রাকাত। যাতে সেজদার সংখ্যা ৪০টি। আর প্রতিটি সিজদাহ আল¬াহ তায়ালার নৈকট্য অর্জনের শ্রেষ্ঠতম একটি স্তর। এর চেয়ে শ্রেষ্ঠতম স্তর আর হতে পারে না। মানুষ যখন আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে যায়, নিজের মর্যাদাময় কপাল মাটিতে ঠুকে দেয়, মুখে জারি থাকে ‘আমার প্রভু শ্রেষ্ঠতম’ তখন এই অবস্থাটি আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠতম স্তর হিসেবে বিবেচিত হয়। নৈকট্যের এই স্তরটিই রাসুলে আকরাম সাল¬াল¬াহু আলাইহি ওয়া সাল¬াম মিরাজের রজনিতে উম্মতের জন্য নিয়ে এসেছিলেন। মিরাজের মাধ্যমে যখন রাসুল সাল¬াল¬াহু আলাইহি ওয়া সাল¬ামকে এত বিশাল মর্যাদায় ভূষিত করা হলো, তখন-তিনি চিন্তা করলেন, এই শাহি দরবার থেকে উম্মতের জন্য কী উপহার উপঢৌকন নিয়ে যাওয়া যায়। তখন আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করলেন, উম্মতের জন্য এই ‘সিজদার’ উপহার নিয়ে যান, প্রতিটি সিজদাহ মুমিন মুসলমানদের জন্য মিরাজ হিসেবে গণ্য হবে। ইরশাদ করেন-নামাজ মুমিনের জন্য মিরাজ স্বরূপ। এর অর্থ হলো-যখন কোন মুমিন বান্দা নিজের কপাল মহান আল¬াহ তায়ালার দরবারে মাটিতে ঠুকে দেবে তখনই তার মিরাজ অর্জিত হয়ে যাবে।

সূরায়ে আলাকে আল¬াহ তায়ালা কতই না সুন্দর বলেছেন, সিজদা করো এবং আমার কাছে চলে আসো। এর মাধ্যমে প্রতীয়মান হলো, প্রতিটি সিজদা আল¬াহ তায়ালার নৈকট্য অর্জনের সিঁড়ি। প্রতিটি সিজদায়ই রয়েছে বিশেষ মর্তবা ও মর্যাদা। আল্লাহর নৈকট্য বা সান্নিধ্য অর্জনের এক বিশেষ স্তর। রমজান মাসে আল্লাহ তায়ালা আমাদের চলি¬শটি সেজদা প্রদানের হুকুম দিয়েছেন। যার অর্থ হলো, প্রত্যেক মুমিন বান্দাহ কেউ দৈনিক নৈকট্য অর্জনের চলি¬শটি স্তর দেওয়া হচ্ছে। আর এটা এ জন্য করা হচ্ছে যে, এগারো মাস পর্যন্ত তোমরা যে কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েছিলে এর ফলে তোমাদের এবং আমার মধ্যে একটি দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল। এই দূরত্ব সরিয়ে দৈনিক চলি¬শটি স্তর দেওয়া হচ্ছে নৈকট্য অর্জনের। এরই নাম হচ্ছে তারাবিহ। সুতরাং তারাবিহকে হালকা কোনো ঈবাদত মনে করা উচিত নয়।

কোনো কোনো মানুষ বলে বেড়ায়, আমরা তারাবিহ নামাজ ৮ রাকাত পড়ব; ২০ রাকাত নয়। এর অর্থ তো এটাই দাঁড়ায়-আল্লাহ তায়ালা তো এ কথাই ইরশাদ করেছেন যে, আমি তোমাদেরকে নৈকট্য অর্জনের জন্য ৪০ টিস্তর দিয়েছি। কিন্তু এসব লোক বলে বেড়াচ্ছে-না; আমাদের তো ১৬টি যথেষ্ট, ৪০টির কোনো প্রয়োজন নেই। প্রকৃত সত্য হলো এসব লোক নৈকট্য অর্জনের স্তরগুলোর মূল্যায়ন করতে এবং এগুলোকে চিনতেই সক্ষম হয়নি। না বুঝে তারা এসব মন্তব্য করছে।

বছরের এগারো মাস শেষ রাতে জেগে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় বেশ কষ্টকর ব্যাপার। কিন্তু রমজান মাসে যেহেতু শেষ রাতে সাহরি খাওয়ার জন্য জাগতেই হয়, তাই একটু কষ্ট করে আগেভাগেই উঠে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায়ের অভ্যাসে পরিণত করে নেওয়া উচিত। কিন্তু এ সকল থেকে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার জিকির করা।