আজ ৩ রমজান : রোজা মানবস্বভাব থেকে পাশবিকতা দূর করে

 
 

মাওলানা মাহমুদুল হাসান ::

Mahe Ramzanআজ তৃতীয় রমজান ১৪৩৮ হিজরি। মাস হিসেবে এই রমজানুল মুবারক এবং ইবাদত হিসেবে সিয়াম সাধনা বা রোজার ফজিলত-মাহাত্ম্য অশেষ, অগণিত। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, রোজা আমার জন্য তার প্রতিদান আমি নিজেই দেব। অন্য রেওয়াতে আছে রোজার প্রতিদান হব আমি নিজেই। মুহাদ্দিসিনরা বলেন, একথার মর্মার্থ হচ্ছে রোজাদার যেহেতু সব ক্ষুধা-পিপাসা ও সংযমিত কষ্ট আমার জন্যই ভোগ করে থাকে, তাই তার প্রতিদান স্বরূপসে আমাকেই পেয়ে যাবে। আর রোজা পালনের মধ্যে তাকওয়া অর্জন এবং অব্যাহত সংযমের যে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়, তার বদৌলতে মুমিন বান্দার জীবনে জান্নাতমুখী বহু চরিত্র-বৈশিষ্ট ও উপকারিতা অর্জিত হয়।

পবিত্র হাদিস শরিফের বিভিন্ন বাণী ও পরবর্তী যুগের বরেণ্য ইসলামি মনীষীদের আলোচনায় সে সব উপকারিতা বহু বিষয় আলোচিত হয়েছে। মুজাদ্দিদে জমান হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভি (রহ.) বলেন, স্বভাবের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে প্রবৃত্তির উপর বিবেকের প্রাবল্য ও নিয়ন্ত্রণ থাকা একান্ত প্রয়োজনীয় হলেও অনেক সময় প্রবৃত্তির তাড়নায় বিবেক কাবু হয়ে যায়। এ জন্যই প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে বিবেকের শক্তিকে প্রবল করার জন্য রোজার বিধান দেওয়া হয়েছে। রোজা মানুষের ভেতরকার আধ্যাত্মিক শক্তিকে বিজয়ী করে তোলে। মানবস্বভাব থেকে পাশবিকতা দূর করে, ফেরেশতাসুলভ নিষ্পাপত্বের প্রেরণা তাতে সৃষ্টি করে।

মাহে রমজানের প্রধান ইবাদত রোজার সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আরো কিছু ইবাদত সাহরি, ইফতার, তারাবিহ, ইতিকাফ, কুরআন তিলাওয়াত, দান খয়রাত জিকির-আজকার ইত্যাদি। রমজান মাসে দিনের বেলা রোজা পালনের ফরজ বিধান এবং রাতে তারাবিহর নামাজে কিয়াম করার সুন্নাতে মুয়াক্কায়দা বিধান দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও বছরের অন্যান্য সময়ের মত রমজানের তাহাজ্জুদ নামাযের ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। তাহাজ্জুদ যে-কোনো সময়ই অত্যাধিক ফজিলতের কারণ।

রমজানে তার সুফল আরো বহুগুণে বেড়ে যায়। রাত্রি জাগরণ করে তারাবির নামাজ পড়া সম্পর্কে হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, যে ব্যক্তি রমজানের রাতে ঈমান ও ইখলাসের সঙ্গে কিয়াম করবে তার পূর্বকৃত সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। তাকওয়া অর্জনের এ মাসে প্রতিটি মুহূর্ত মুমিন মুসলমানদের জন্য মহামূল্যবান। তাই তাকওয়া কী, সে সম্পর্কে জানার জন্য পড়াশোনা বা চেষ্টা করাও প্রয়োজন।

হাদিসের আলোকে জানা যায় যে, ভালো-খারাপের মাপকাঠি হচ্ছে তাকওয়া বা পরহেজগারি। যার তাকওয়া আছে মানবসমাজে সেই উত্তম ব্যক্তি হিসেবে বর্ণিত হওয়ার যোগ্য। এ পর্যায়ে তাকওয়া বা পরহেজগারির আলামত কি তা জেনে রাখা দরকার। ইমাম জালালুদ্দীন সিয়ুতি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, তাকওয়ার আলামত হলো ১০টি-(১) গর্বও অহংকার না করা (২) যে-পথে ক্ষতির বা অনিষ্টের আশঙ্কা রয়েছে সে পথ থেকে দূরে অবস্থান করা (৩) নেক আমলকে বিনষ্টকারী বিপজ্জনক বিষয়সমূহ হতে মুখ ফিরিয়ে রাখা (৪) পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন অন্তঃকরণে সততা ও সত্যবাদিতার সাথে আমানত রক্ষা করা (৫) আল্লাহ তায়ালার রেজামান্দ সন্তুষ্টির অšে¦ষণে সদা সর্বদা সুদৃঢ় ও স্থায়ী থাকা। (৬) প্রত্যেক কাজের লাভ ও লোকসানের প্রতি গভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা। (৭) অস্তির ও চাঞ্চল্যকর বিষয়সমূহ হতে নিরাপদ দূরে থাকা। (৮) ভাল ও মন্দের পার্থক্য করণে খুব সচেতনতার সাথে অনুসন্ধান করা। (৯) সন্দেহজনক বস্তুসমূহ বর্জন করা। (১০) দুর্বোধ্য ও বুদ্ধির নাগালের বাইরের বস্তুসমূহ সম্বন্ধে খুব গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা।

হজরত শায়খ আহমদ মাসরুক রহ. বলেছেন, তাকওয়া ও পরহেজগারি এই যে পার্থিব বা জাগতিক নেয়ামত ও স্বাদ উপভোগের প্রতি কখনো ভ্রƒক্ষেপ করবে না। এমনকি মনের মধ্যে সেই সমুদয়ের চিন্তা ও কল্পনা আদৌ স্থান দেবে না। আল্লাহ তায়ালা এই মর্যাদায় প্রত্যেক সিয়াম সাধনাকারীকে অধিষ্ঠিত করুন।